নিজস্ব প্রতিনিধি ২৫ জুন ২০২৫ , ৯:৩১:৫৮ প্রিন্ট সংস্করণ
ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এখন যেন একটি দুর্নীতির চক্রের নির্লজ্জ ঘাঁটি। এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন উপসহকারী প্রকৌশলী জিয়াউর রহমান, যিনি ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ অনুমোদন করেন না—এমন অভিযোগ এখন এলজিইডির অলিখিত বাস্তবতা। টেন্ডার প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে বিল অনুমোদন, নির্মাণ সামগ্রী যাচাই কিংবা কাজের মান তদারক—সবকিছুতেই জিয়াউরের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ, বিতর্কিত এবং ঘৃণিত।
সম্প্রতি কাঠালিয়া উপজেলার সোনারবাংলা বাজার সংলগ্ন একটি গার্ডার ব্রিজে স্ল্যাব ঢালাইয়ের সময় নির্মাণসামগ্রীর গুণগতমানহীনতার কারণে ঢালাই চলাকালীন রাতেই ব্রিজটি ডেবে যায়। অথচ এই প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বে ছিলেন স্বয়ং উপসহকারী প্রকৌশলী জিয়াউর রহমান। ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয়রা জানান, নিম্নমানের রড, অপর্যাপ্ত কংক্রিট ও তড়িঘড়ি করে ঢালাইয়ের ফলে এই বিপর্যয় ঘটে। কিন্তু সংবাদকর্মীরা এ বিষয়ে তার মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি অত্যন্ত উদ্ধত ভঙ্গিতে বলেন, “সাংবাদিকদের এই সব বিষয়ে জানার দরকার নেই”—বলেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
এ আচরণে স্পষ্ট, জিয়াউর রহমানের চরম বেপরোয়া ও দুঃসাহসিক দুর্নীতির আড়ালে রয়েছে শক্তিশালী রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া। অনুসন্ধানে জানা যায়, তিনি রাজাপুর এলজিইডি অফিস থেকে দুর্নীতির দায়ে সরিয়ে দেওয়ার পর ঘুষ-তদবিরের মাধ্যমে পুনরায় কাঠালিয়ায় নিয়োজিত হন। এ পদে আসতে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন করেন, এবং এখন সেই ‘পুঁজি’ সুদে-আসলে পুনরুদ্ধারে উঠেপড়ে লেগেছেন।
বিল অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ইচ্ছাকৃত বিলম্ব, কৌশলে কাজ আটকে রাখা, এবং মোটা অঙ্কের উৎকোচ ছাড়া কোনো কার্যক্রম শুরু করতে না দেওয়াই এখন কাঠালিয়া এলজিইডির নিয়মে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি অর্থ আত্মসাতে তিনি একের পর এক ভুয়া বিল ও ভাউচার তৈরি করেছেন। তার নামে ও বেনামে অর্জিত বিপুল সম্পদের মধ্যে রয়েছে অস্বাভাবিক ব্যাংক ব্যালান্স, জমি, গাড়ি ও উচ্চমূল্যের নগদ অর্থ। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তিনি সরকারি অফিসের কর্মচারীদের মুখ বন্ধ রাখতে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন এবং স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের নাম ভাঙিয়ে দম্ভের রাজনীতি চালিয়ে যান।
একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মচারী জানান, “রাজাপুরে নানা কেলেঙ্কারির পর বদলি হলেও আবার কাঠালিয়ায় ফিরে এসে আরও ভয়ঙ্কর রূপে দুর্নীতি করছেন জিয়াউর রহমান। তার টিকে থাকার রহস্যই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।” রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং প্রশাসনিক অসাড়তা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই জিয়াউর হয়ে উঠেছেন ‘অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতিবাজ’।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের বিল বাঁচিয়ে দিয়ে কমিশন খেয়ে থাকেন, আবার কখনো কখনো বিএনপির নাম করে সাংবাদিকদের ভয় দেখান। একাধিক সাংবাদিক জানিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে রিপোর্ট করতে গেলে তিনি ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতার আত্মীয় পরিচয় দিয়ে হুমকি দেন এবং ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দিতে চান।
উপজেলা প্রকৌশলীর ভূমিকাও এই দুর্নীতির বৃত্তে নিরব সহযোদ্ধার মতো। যখন তার কাছে এই দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়, তিনি নির্বিকারভাবে জানান—“আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না।” প্রশাসনিক এই নির্লজ্জ উদাসীনতাই জিয়াউরের মতো কর্মকর্তাদের দুর্নীতির লাইসেন্স দিয়ে রেখেছে।
কাঠালিয়াবাসী আজ ক্ষুব্ধ। তারা বলছেন, “একজন দুর্নীতিগ্রস্ত, উদ্ধত, দম্ভচূড়ান্ত প্রকৌশলীর নেতৃত্বে কাঠালিয়ার উন্নয়ন নয়—বরং ধ্বংসই হবে অনিবার্য।” তারা জিয়াউর রহমানের অপসারণ এবং একজন সৎ, আদর্শবান প্রকৌশলীর নিয়োগ দাবি করেছেন। স্থানীয়দের ভাষায়, “এই কর্মকর্তা যতদিন কাঠালিয়ায় আছেন, ততদিন উন্নয়ন কাজ নয়—চলবে লুটপাটের উৎসব।”
সরকার যদি প্রকৃত অর্থে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী হয়, তবে কাঠালিয়া এলজিইডির এই ভয়াবহ দুর্নীতি বন্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায়, স্থানীয় জনগণের আন্দোলন জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়বে—যার দায় সরকারকেই নিতে হবে।










