• ঢাকা, বাংলাদেশ    
  • বৃহস্পতিবার , ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ,১৬ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • জাতীয়

    চাকার তলে চুকা গপ্পো

      এম এইচ মুন্না ২৯ অক্টোবর ২০২৬ , ৮:৩৩:১০ প্রিন্ট সংস্করণ

    সড়কের বুকে চাকা ঘুরিলেই কি তাহা ‘সড়ক দুর্ঘটনা’? নাকি ভাগ্যের চাকার ফোঁড়নে আঞ্চলিক ভ্যানগাড়ি উল্টাইলেও তাহার আস্ত দায় ঝুলিয়া পড়ে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের স্কন্ধে? রাজপথের পিচঢালা কালো পিঠে প্রতিদিন কত শত গল্পের ইতি ঘটে, আর সেই ইতিটানকেই পাইকারি দরে ‘সড়ক দুর্ঘটনা’র তকমায় মুড়িয়া মন্ত্রণালয়ের ঘাড়ে চাপাইয়া দেওয়ার এই মহোৎসব ও ধুমধাম চর্চায় চরম উষ্মা আর ঝাঁঝালো ক্ষোভ উগরাইয়া দিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। রাজধানীতে নিরাপদ সড়ক দিবসের এক জমজমাট ও ভারী আসরে তিনি সোজাসাপ্টা ভাষায় বলেন, যেখানে-সেখানে দূর-দূরান্তের কোনো গাঁও-গেরামে ভ্যান উল্টিয়া দুর্ঘটনা ঘটিলেও সব দায় সড়ক মন্ত্রণালয়ের ঘাড়ে ঠেলিয়া দেওয়ার যে একতরফা অভ্যাস গড়িয়া উঠিয়াছে, সেই মনগড়া ভাবনার খোলস ভাঙিয়া এবার সুমতি ফিরাইতে হইবে। দুর্ঘটনা বৈকি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, তাহা অস্বীকারের জো নেই; তবে ঘটা করিয়া সব অনভিপ্রেত অঘটনকে ‘সড়ক দুর্ঘটনা’ আখ্যা দিয়া মন্ত্রকের গালে কালি লেপন করা কতখানি যুক্তিযুক্ত, সেই কঠিন ও জটিল সমীকরণ তিনি ছুড়িয়া দিলেন সুধী সমাজের দিকে।

    যাত্রী অধিকারের ঢাকঢোল পিটানো নানাবিধ নামকাওয়াস্তে বেসরকারি সংগঠনগুলোর প্রতি মাসে বাৎসরিক মোড়কে প্রকাশিত দুর্ঘটনার চটজলদি পরিসংখ্যান লইয়াও মন্ত্রীর গলায় বাজিল কড়া তালের সুর। হুট করিয়া ঘুম ভাঙিয়াই দিনে ৮৫ জন মানুষ সড়কে নিপাত যাওয়ার এমন কাল্পনিক ও ভৌতিক তথ্য তাহারা কোন্ অলৌকিক ঝোলা হইতে কুড়াইয়া আনেন, আর জাদুকরী কাঠির ছোঁয়ায় কীভাবে এসব উপাত্ত তৈয়ারি হয়, তাহা লইয়া তুলিলেন চরম সংশয়। পরিবহন খাতের চাকা কীভাবে ঘোরে তাহার বিন্দুবিসর্গ না জানিয়া, খাতটির নাড়ি-নক্ষত্রের খবর না রাখিয়া জাতিকে বিভ্রান্তির গোলকধাঁধায় বন্দি করার এই খামখেয়ালি খেলার রহস্য কী, মন্ত্রী মহাসয় সেই প্রশ্ন তুলিয়া সাফ জানাইয়া দিলেন যে, ভুল তথ্যের চটুল খেলায় মেতে থাকা বন্ধ করিয়া প্রকৃত ডেটাবেজভিত্তিক সত্য উপাত্তই এখন সময়ের দাবি, যাহা দিয়া ২০৩০ সালের মধ্যে এই মৃত্যুর মিছিল অর্ধেকের কোঠায় নামাইয়া আনা সম্ভব হইবে।

    আগেকার দিনের এনালগ বা ম্যানুয়াল কায়দার ধীরগতির তথ্য সংগ্রহের দিন ফুরাইয়া এখন যে আধুনিক প্রযুক্তির ডেটাবেজভিত্তিক সুপরিকল্পনায় রোডের ত্রুটিযুক্ত নকশা শুধরাইয়া দুর্ঘটনা ২৫ শতাংশ কমাইয়া ফেলার মহাসড়ক তৈরি হইতেছে, তাহারও হিসাব পেশ করিলেন তিনি। শুধুই কি তাই? পরিবহন মালিক, শ্রমিকনেতা কিংবা তথাকথিত সড়ক বিশেষজ্ঞদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী এক হাঁক মারিয়া বলিলেন, চাকা সচল রাখিয়া দুর্ঘটনার হার কমানোর মতো কোনো টেকসই ও কড়া নকশা যদি সাত দিনের মধ্যে তাঁহার টেবিলে জমানো যায়, তবে সাত দিনের মাথায়ই নতুন মেগা প্রকল্পের শিলান্যাস ঘটিবে। কিন্তু সেইসাথে ড্রাইভারদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও হুশ-জ্ঞানহীন চালনার তিতা সত্যটাও কড়া বাক্যে হজম করাইতে ছাড়েন নাই তিনি; কেননা রাতারাতি পাকা ড্রাইভার বানানোর কোনো জাদুমন্ত্র যেমন সরকারের কাছে নাই, তেমনি মালিক সমিতির কাণ্ডারিরা অমূল পরিবর্তনের বুলি আওড়াইলেও বাস্তবে বদলের চাকা ঘোরে অতীব মন্থর গতিতে।

    লাইসেন্স না পাওয়ার ভ্যাঁভ্যাঁ কান্নাকাটি আর দক্ষ চালকের আকালের অজুহাত তোলা বাস মালিকদের উদ্দেশেও মন্ত্রী বলিলেন, মালিকরা নিজ প্যাডে সিল-ছাপ মারিয়া চালকের যোগ্যতার মুচলেকা দিলেই আর পরীক্ষার কঠিন বেড়াজালে না আটকাইয়া অমনি মিলিয়া যাইবে ড্রাইভিং লাইসেন্স, তবে কালক্রমে সেই চালক বেপরোয়া হইয়া গাড়ি খাদে ফেলিলে তাহার ঘাড়ধাক্কা ও যাবতীয় দায়ভারও নিতে হইবে ওই স্বাক্ষরকারী মালিকদেরই! শুধু চালক আর মালিককে কাঠগড়ায় তুলেই ক্ষান্ত হন নাই তিনি, যাত্রীদের গাফিলতি ও উদাসীনতার থলের বিড়ালও ছাড়িয়া দিলেন প্রকাশ্যে; ফিটনেসহীন ধড়ফড়ে ও জরাজীর্ণ বাসে চড়া বন্ধ করার প্রথম মানসিক ধাক্কাটি যাত্রীদেরই দিতে হইবে, কারণ রং ড্রাইভে গাড়ি চালানকালে নিজের অমূল্য প্রাণখানাও যে স্টিয়ারিংয়ের সাথে ঝুলিয়া থাকে, সেই হুঁশ হারিয়ে বেপরোয়া চালকদের সাথে যাত্রীদের নীরব সখ্যতাও বড় অদ্ভুত।

    ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের শেষ সীমানায় যে একেবারে আনকোরা ‘সড়ক পরিবহন আইন’ ডানা মেলিতে যাচ্ছে, বিশ্বব্যাংকের হাত ধরিয়া ব্লেক-স্পট বা দুর্ঘটনাপ্রবণ মোড়গুলো সোজা করিয়া আঞ্চলিক সড়কের সংযোগস্থলে ৯০ ডিগ্রির খাঁটি লেফট-টার্ন বা ডাইভারশনের মোড় ঘোরানো হইতেছে, তাহার বিবরণও দেন তিনি। আইন রূপায়ণে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বজ্ঞান হীনতার গোমর ফাঁস করিয়া মন্ত্রী জানান, ফিটনেস ছাড়া লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি ধরিয়াও যদি কোনো পুলিশ কর্মকর্তা মালিকের গোপন চাপে কিংবা অলিখিত প্রভাবে সটান ছাড়িয়া দেন, আর পরবর্তীতে সেই গাড়ি কোনো জীবন কাড়িয়া নেয়, তবে ওই ট্রাফিক কর্মকর্তার কলার চেপে ধরিয়া তাহার কাঁধেই পিষে যাওয়া প্রাণের সব দায় চাপানো হইবে।

    পরের ঘাড়ে দোষ চাপাইয়া নিজের হাত ধুইয়া ফেলার যে চিরচেনা সস্তা সংস্কৃতি আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুরপাক খাইতেছে, তাহা হইতে বাহির না হইলে রাজপথ কখনোই নিরাপদ হইবে না। আজ যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দাপটে ঢাকা শহর তিলে তিলে জরাজীর্ণ ও এক অচল জটলায় পরিণত হইল, কই কোনো সুশীল নাগরিক তো নিজ গলির মুখে বা নিজের আত্মীয়ের বেপরোয়া থ্রি-হুইলার চালানোর বিরুদ্ধে টুঁ-শব্দটিও করিলেন না! অথচ মুখে মুখে দেশের আমূল পরিবর্তন চাইবার তাত্ত্বিক বুলি ফোটান সকলেই। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব জিয়াউল হকের গুরুগম্ভীর সভাপতিত্বে আয়োজিত এই রাজকীয় আসরে মঞ্চ আলো আলো করিয়া উপস্থিত ছিলেন প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিদ্বয় অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস ও রকিবুল ইসলামসহ পরিবহন জগতের বাঘা বাঘা মালিকনেতা, সওজের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান, বিআরটিএ প্রধান মো. হাবীবুর রহমান, সেতু সচিব মো. আবদুর রউফ এবং বিআরটিসি চেয়ারম্যান মীর আহমেদ তারিকুল ওমরের মতো তাবড় তাবড় নীতিনির্ধারকেরা।