নিজস্ব প্রতিবেদক ৩১ অক্টোবর ২০২৬ , ২:১৯:৩৭ প্রিন্ট সংস্করণ
পসরা সাজিয়ে বসে থাকা চট্টগ্রাম বন্দর জেটি জাতীয় অর্থনীতির লাইফলাইন বা মূল ধমনী বলিলেই চলে। কিন্তু এর জেটি চত্বর, ইয়ার্ড কিংবা কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের অলিগলিতে আজ ঘাপটি মেরে বসেছে দুর্নীতির সর্বগ্রাসী সিন্ডিকেট, যেখানে নীতি-নৈতিকতার টুটে যাওয়া দমের শব্দে প্রকম্পিত সমগ্র বন্দর ও বাণিজ্যাঞ্চল! দূর থেকে দেখলে ঠাওর করা দায়- এটি কি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার নাকি বহিরাগত দালাল, সিঅ্যান্ডএফের ভুয়া প্রতিনিধি আর অসৎ লবিস্টদের অবাধ লুটেরা বাজার। সাধারণ আমদানকারক বা সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধি যখন ঘাম ঝরিয়ে জেটির চৌকাঠে পা রাখেন, তখন তাঁদের সামনে কুহেলিকার এক গোলকধাঁধা তৈরি হয়; কে এখানে সত্যিকারের বন্দর বা কাস্টমসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আর কে ছদ্মবেশী দালাল বা জেটি সরকার, তার ফারাক করাই যেন এক অসম্ভব প্রহেলিকা।
কম্পিউটার অপারেটর, ডকুমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট কিংবা বড়কর্তাদের ডানহাত সেজে একদল বহিরাগত চক্র বন্দরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমনভাবে জেঁকে বসেছে যে, তাদের পকেট ভারী না করলে একটি ফাইল বা কন্টেইনারের ডকুমেন্ট নড়ারও জো নেই। অভিযোগের এই বিষবাষ্প কোনো একটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বন্দরের গেইট পাস শাখা, কন্টেইনার ইয়ার্ড, ডেলিভারি পয়েন্ট, অডিট সেকশন থেকে শুরু করে অপারেশনাল ও ট্রাফিক বিভাগের প্রায় প্রতিটি শাখায় এখন সমান্তরাল এক দুর্নীতির প্রশাসন রাজত্ব করে চলেছে।
নিয়মনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জেটিতে কৃত্রিম কন্টেইনার জট তৈরি করার এক অদ্ভুত সংস্কৃতি চালু রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য খালাস বা স্ক্যানিংয়ের নামে ইচ্ছাকৃত দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করে ব্যবসায়ীদের জিম্মি করা হয়। স্ক্যানার মেশিনের কৃত্রিম ত্রুটি বা ধীরগতির অজুহাতে প্রতিটি কন্টেইনার ডেলিভারিতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পুরোনো। বন্দরের পাস নিয়মকে ফাঁকি দিয়ে বা অসাধু উপায়ে কার্ড বাগিয়ে এক শ্রেণির বহিরাগত ও ভুয়া ‘জেটি সরকার’ ভেতরে প্রবেশ করে। কন্টেইনার ডেলিভারি অর্ডার (ডি/ও), গেট পাস তৈরি এবং ফিজিক্যাল ইন্সপেকশনের নামে এই অননুমোদিত চক্রটি সরাসরি নগদ উৎকোচ আদায় করে। অনেক ক্ষেত্রে আমদানি করা পণ্যের বিবরণ বা এইচএস কোড (HS Code) বদলিয়ে কম শুল্ক পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেওয়া কিংবা এর উল্টোটি দেখিয়ে হয়রানি করার মাধ্যমে বিশাল অংকের ঘুষ লেনদেন হয়। কেমিক্যাল, টেক্সটাইল বা কাস্টমসের নিলামযোগ্য কন্টেইনারগুলো নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দ্রুত নিষ্পত্তি না করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বছরের পর বছর ফেলে রেখে গুদাম দখল করে রাখার নেপথ্যেও রয়েছে আর্থিক ফায়দা হাসিলের ফন্দি।
বন্দর জেটি গেট থেকে শুরু করে বিভিন্ন শেডের ইনচার্জ বা ফাইল মুভমেন্টের টেবিলে ‘স্পিড মানে’ বা চা-নাস্তা খরচ ছাড়া কোনো নথিতে সই মেলে না। ফাইল আটকে রেখে আমদানিকারকদের ডিমারেজ বা অতিরিক্ত পোর্ট চার্জের মুখে ঠেলে দিয়ে পরবর্তীতে নেপথ্য সমঝোতার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয় লাখ লাখ টাকা। অনেক সময় সঠিক প্রক্রিয়া না মেনে বা শিপিং এজেন্টদের সাথে গোপন আঁতাত করে খালি কন্টেইনার কিংবা রপ্তানি পণ্য জোরপূর্বক জাহাজে তুলে দেওয়ার (Force Shipment) ঘটনা ঘটে, যার পেছনে কাজ করে নির্দিষ্ট অর্থ লেনদেনের সিন্ডিকেট। বন্দর জেটি এলাকা থেকে মূল্যবান আমদানিকৃত চালান বা কন্টেইনার জালিয়াতির মাধ্যমে গায়েব হয়ে যাওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনাও মাঝেমধ্যে প্রকাশ পায়। সিসি ক্যামেরা ও কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতর কীভাবে এসব সংঘটিত হয়, তার মূলে রয়েছে ভেতরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাথে বাইরের চক্রের যোগসাজশ।
পরের ঘাড়ে দোষ চাপাইয়া নিজের দায়মুক্তির যে সংস্কৃতি কন্টেইনার টার্মিনাল থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারী মহল পর্যন্ত ডালপালা মেলিয়াছে, সেখান হইতে বাহির না হইলে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য কভুও গতি পাইবে না। আজ বন্দর জেটিতে জালিয়াতি ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে আমদানি খরচ চড়িয়া যাইতেছে, অথচ তাত্ত্বিক সংস্কারের বুলি আওড়ানো ছাড়া এর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়িয়া তুলিতে সুশীল সমাজ কিংবা সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনগুলোও যেন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করিতেছে। বন্দর ও কাস্টমসের নীতিনির্ধারকেরা যদি অবিলম্বে এই ঘুণে ধরা ম্যানুয়াল খোলস ভাঙিয়া আধুনিক ডিজিটাল ট্র্যাকিং, জিরো টলারেন্স নীতি এবং বহিরাগতদের প্রবেশ চিরতরে বন্ধের কড়া দাওয়াই না হানেন, তবে অর্থনীতির এই মূল হৃৎপিণ্ডকে বাঁচানো মুশকিল হইয়া দাঁড়াইবে।











