• ঢাকা, বাংলাদেশ    
  • বৃহস্পতিবার , ১ অক্টোবর ২০২৬ ,১৬ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • অপরাধ

    ভ্যাট কর্মকর্তা আ. সামাদের ‘আলাদীনের চেরাগ

      নিজস্ব প্রতিবেদক  ১ অক্টোবর ২০২৬ , ১:৩৫:৩৭ প্রিন্ট সংস্করণ

    রাজস্বের সুরক্ষিত অন্দরে বসে আড়ম্বর আর বিত্তের বিলাসীতে মত্ত, কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এর বিতর্কিত সহকারী কমিশনার আব্দুস সামাদ (যাঁকে পরবর্তীতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের স্বাভাবিক প্রশাসনিক বদলি ও পদায়নের মাধ্যমে ঢাকা বৃহৎ করদাতা ইউনিট এলটিইউ-ভ্যাটে নিযুক্ত করা হয়); যাঁর আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার অঢেল সম্পত্তির সরজমিন চিত্র প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

    ক্ষমতার জাদুদণ্ড হাতে পেয়ে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির চোরাবালিতে অবগাহন করে বাবার রেখে যাওয়া সামান্য ১০-১১ বিঘার ছিমছাম পৈতৃক ভিটেকে যিনি চতুরতার জটিল কৌশলে রাতারাতি ফুলেফেঁপে ৫০ বিঘার বিস্তৃত সাম্রাজ্যে পরিণত করেছেন, তাঁর এই চোখধাঁধানো রূপান্তর যেন রুপকথাকেও হার মানায়। বগুড়ার গাবতলী উপজেলার কালুডাংগা গ্রামের নিভৃত প্রান্তর থেকে রাজস্ব ভবনের উচ্চাসনে সামাদের এই উল্কার বেগে উত্থান গ্রামের বয়োবৃদ্ধ থেকে শুরু করে অনুসন্ধানী কলমযোদ্ধাদেরও হতবাক করে দিয়েছে। গ্রামে যেকোনো সাধারণ মানুষ জমি বিক্রির সামান্য ইশারা দিলেই সামাদ সাহেব নাকি অন্য দশজনের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি আকাশছোঁয়া দাম হেঁকে সেই মাটি গোগ্রাসে গিলে নেন। কালুডাংগা পেরিয়ে শালুকগাড়ি আর হারা খাল ব্রিজের ঠিক আগেই কুশোয়াটা মৌজায় একদাগে ৭ বিঘার বিশাল ভূখণ্ড পকেটে পুরে তিনি যেমন আলোচনার ঝড় তুলেছিলেন, তেমনি ব্রিজের ডান পাশের স্যালো মেশিনসংলগ্ন আরও ১৫-২০ বিঘার বিস্তৃত প্রান্তর আর গুচ্ছগ্রামের কোলঘেঁষে নিজের ফলের বাগান বানিয়ে নিজের অন্তহীন লোভের সীমানাকে প্রসন্ন করেছেন; এমনকি শ্বশুরের এলাকা ফুলবাড়ী মৌজাতেও শত শত আবাদি জমি কিনে নিজের অর্থলিপ্সার ক্ষুধাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন।

    গ্রামের দিগন্তজোড়া ফসলি জমিতেই কিন্তু এই অর্থপিপাসুর নেশা মেটেনি, বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র চক লোকমান জামে মসজিদের একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের চার তলাবিশিষ্ট সুরম্য ডুপ্লেক্স অট্টালিকাটি যেন তাঁর সুকৌশলী দুর্নীতির দৃশ্যমান রাজপ্রাসাদ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এই রাজকীয় প্রাসাদের পাশাপাশি গ্রামের ভিটেতেও গড়েছেন বিশালাকারের আরেকটি আধুনিক ভবন, যা দেখলে যেকোনো সাধারণ মানুষের চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। সন্তানের উচ্চশিক্ষার পেছনে জলের মতো টাকা ছেটানোর মহোৎসবে তিনি মেয়ে মুনমুনকে ১৫-২০ লাখ টাকার পাহাড় ঢেলে ডাক্তারি পড়িয়েছেন, আরেক মেয়ে তানসিনকে ভর্তি করেছেন নামীদামী কলেজে, জ্যেষ্ঠ পুত্র রিয়াদকে পাঠিয়েছেন মহার্ঘ্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং কনিষ্ঠ পুত্র রিফাতকে রেখেছেন মাদ্রাসায়। এত কোটি কোটি টাকার পারিবারিক রাজকীয় খরচের মধ্যেও সামাদ সাহেব কিন্তু তাঁর সহধর্মিণীকে এতটুকু বঞ্চিত করেননি; বগুড়া নিউমার্কেটে নিজের এক নিকটাত্মীয়ের বিলাসবহুল জুয়েলারি দোকান থেকে বিভিন্ন সময়ে স্ত্রীকে কিনে দিয়েছেন অন্তত শতাধিক ভরি খাঁটি স্বর্ণালংকার- যদিও অনুসন্ধানের শুভক্ষণে সেই জুয়েলারির দোকানটি রহস্যজনকভাবে বন্ধ থাকায় স্বর্ণের চূড়ান্ত পরিমাণের নিখুট হিসাব মেলা সম্ভব হয়নি।

    সব মিলিয়ে এই কাস্টম কর্মকর্তার দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সম্পদের বিশাল পাহাড় ইতিমধ্যেই শতকোটি টাকার অবিশ্বাস্য মাইলফলক পার করে গেছে, যা একজন সরকারি কর্মচারীর সারাজীবনের সৎ ও অর্জিত বৈধ আয়ের সাথে কেবল অমিলই নয়, বরং চরম অসঙ্গতিপূর্ণ ও অপরাধমূলক। এনবিআরের দায়িত্বশীল মহলের মতে, সরকারি নির্দিষ্ট স্কেলের সামান্য বেতনের টাকায় এমন বিলাসী জীবনযাপন ও সম্পদের পর্বত গড়ে তোলা স্রেফ অলৌকিক এবং অবাস্তব। অতীতে বগুড়া শহরে এই চোখধাঁধানো প্রাসাদ নির্মাণের সময় বিষয়টি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরে আসলেও, ক্ষমতার দাপট আর অঢেল কালো টাকার গোপন লেনদেনের জাদুতে সামাদ সাহেব সেই যাত্রায় সকল তদন্তের ফাইল বরাবরের মতোই ধামাচাপা দিতে সক্ষম হন বলে জোর জনশ্রুতি রয়েছে।

    অনুসন্ধানের স্বার্থে ও সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব বজায় রেখে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর সুনির্দিষ্ট বক্তব্য জানতে তাকে কল করা হলে তিনি বলেন, “এর আগেও আমাকে পাঁচজন কল করেছে? আপনারা আসলে কতজন? আপনার কাছে তথ্য থাকলে নিউজ করে সমস্যা কি? কথাগুলো বলেই তিনি ধড়াস করে ফোনের সংযোগটি কেটে দেন।