এম এইচ মুন্না ২৯ অক্টোবর ২০২৬ , ৩:৩৩:৪৫ প্রিন্ট সংস্করণ
কর্ণফুলীর বহমান ঢেউয়ের বুকে পিনপতন নীরবতা ভেঙে এবার রচিত হতে চলেছে এক অনন্য ইতিহাস, যেখানে খরস্রোতা নদীর দুই পাড়কে এক সুতোয় বাঁধতে সড়ক ও মহাসড়কের মুকুটে যুক্ত হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম চার লেনের দৃষ্টিনন্দন ‘ক্যাবল-স্টেইড’ সেতু। রাঙামাটির কাপ্তাই আর চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার সীমানা ছুঁয়ে চন্দ্রঘোনা-রাইখালী ফেরিঘাটের চিরচেনা সেই দীর্ঘ সারি ও দীর্ঘশ্বাসের অবসান ঘটিয়ে সওজ অধিদপ্তরের ইস্পাতি হাতে ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকার এই সুবৃহৎ কর্মযজ্ঞ এখন কেবলই প্রশাসনিক টেবিল পেরিয়ে এক অবধারিত সম্ভাবনার সোনালী সকাল।
জানা যায়, ৩৭ বছর ধরে যে ফেরির পন্টুনের কড়া নাড়া, ডুবোচরের অন্তরায় আর কাপ্তাই বাঁধের জলপ্রপাতের খামখেয়ালিপনায় আটকে ছিল হাজারো মানুষের জীবন ও জীবিকা, সেই রুদ্ধদ্বার কপাট খুলে দিয়ে ৫৩২ মিটার দীর্ঘ এই আধুনিক সেতুটি পাল্টে দিতে আসছে রাঙামাটি, চট্টগ্রাম ও বান্দরবানের কোটি মানুষের ভাগ্যাকাশের চাকা। সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমার মুন্সিয়ানায় ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী কীর্তি নিশান চাকমার নিপুণ পরিকল্পনাধীন ৭ দশমিক ৫২ হেক্টর জমির ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চলা এই বিস্ময়কর স্থাপনায় থাকছে ৪৫৫ মিটার ভায়াডাক্ট, ১ হাজার ২৫০ মিটারের বেশি এলিভেটেড সড়ক এবং ২৩৫ কোটি টাকার ভূমি অধিগ্রহণের নিখুঁত বন্দোবস্ত। বীণার তারের মতো হেলে থাকা পিলারের জাদুকরি মায়ায় নদীর বুকে একটি স্তম্ভেরও প্রয়োজন না পড়ে গড়া এই সেতুতে যুক্ত হচ্ছে আধুনিক ‘ব্রিজ স্মার্ট হেলথ মনিটরিং সিস্টেম’ ও স্বয়ংক্রিয় টোল প্লাজা, যা রাতের আঁধারেও রাঙামাটি-বান্দরবান আঞ্চলিক মহাসড়কের আর-১৬১ নম্বর কিলোমিটারে জ্বেলে দেবে উন্নয়নের অমলিন বাতিঘর।
প্রতিদিনের হাজারো ট্রাকের জ্যাম, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাম্পানে নদী পারাপার কিংবা গভীর রাতে অ্যাম্বুলেন্সে ছটফট করা জরুরি রোগীদের সেই মরমী করুণ চিত্র ঘুচিয়ে, পাহাড়ের কৃষিপণ্যকে দ্রুততম সময়ে সমতলের হাটে পৌঁছে দিতে এবং পর্যটকদের মন রাঙাতে একনেকের সবুজ সঙ্কেত পেলেই ২০৩১ সালের লক্ষ্যমাত্রা ছুঁয়ে এই মেগাপ্রকল্প রূপ নেবে বাস্তবতায়, যা ব্যবসায়ীদের মুখে ফুটিয়েছে হাসির ঝিলিক আর ড্রাইভার আলম থেকে শুরু করে রবিন কিংবা ধনপতি রায়ের মতো খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের অন্তরে বুনে দিয়েছে এক নতুন স্বপ্নীল আগামী।
এ বিষয়ে রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা প্রকৌশল সংবাদকে বলেন,
“এই ক্যাবল-স্টেইড সেতুটি রাঙামাটি ও বান্দরবানের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে বিশ্ববাসীর কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার এক সুবর্ণ সুযোগ। চার দশকের দীর্ঘ ফেরি-দুর্ভোগের অবসান ঘটিয়ে এই সেতু পার্বত্য অঞ্চলের পর্যটনশিল্পে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটাবে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকরা এখন কোনো ঝক্কিঝামেলা ছাড়াই খুব সহজে পাহাড়ি উপত্যকার রূপ দেখতে পারবেন। যাতায়াত ব্যবস্থার এই আধুনিকায়ন শুধু পর্যটনই নয়, বরং সমগ্র অঞ্চলের অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।”











