• ঢাকা, বাংলাদেশ    
  • সোমবার , ৫ অক্টোবর ২০২৬ ,১৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • প্রকৌশল সংবাদ

    ৪০ কোটির ঝিনাইদহ মেগা সড়কে শুভঙ্করের ফাঁকি

      এম এইচ মুন্না ৫ অক্টোবর ২০২৬ , ১২:৫৭:৩৮ প্রিন্ট সংস্করণ

    ঝিনাইদহ শহরকে যানজটের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে এবং শহরের রূপসৌন্দর্য বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে হাতে নেওয়া ৪০ কোটি টাকার মেগা সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে চরম অনিয়ম ও চাতুর্যের অভিযোগ উঠেছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের আওতাধীন সাড়ে ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে ‘ম্যাকাডম’ (নির্দিষ্ট গ্রেডের ইটের খোয়া বা পাথরের টুকরো, ডাস্ট ও পানির নিরেট মিশ্রণ)-এর স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে সস্তা আস্ত ইট ও মাটি! প্রকৌশল বিজ্ঞানের তোয়াক্কা না করে নিম্নমানের এ কাজের পর রোববারের (৪ অক্টোবর ২০২৬) সরজমিন পরিদর্শনে গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে তড়িঘড়ি করে এক্সকাভেটর (ভেকু) দিয়ে সড়ক থেকে আস্ত ইট তুলে নিতে দেখা গেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে।

    সড়ক নির্মাণ বিধিমালা ও প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের মতে, ম্যাকাডম পদ্ধতিতে বিভিন্ন সাইজের পাথর বা ইটের টুকরো ডাস্ট ও পানির সাথে কম্প্যাক্ট হয়ে এক নিরেট (Interlocking) জালের মতো শক্ত ভিত্তি গঠন করে। যা ভারী যানবাহনের চাপ সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম। কিন্তু সেখানে আস্ত ইট বিছিয়ে রোলার করায় মারাত্মক ফাঁক থেকে যাচ্ছে। ফলে ট্রাক-বাস চলাচলের সময় আস্ত ইট ভেঙে দেবে যাওয়া ও গর্ত সৃষ্টির চূড়ান্ত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। উপরন্তু আস্ত ইটের সংযোগস্থলে জমে থাকা পানি সাবগ্রেডে পৌঁছে পুরো সড়ক ধসিয়ে দেবে, যা স্বাভাবিক ম্যাকাডম স্তরে বিটুমিন ও ডাস্টের সুষম ব্যবহারের মাধ্যমে বন্ধ করা সম্ভব ছিল।

    অনুসন্ধানে জানা যায়, ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনাল থেকে আড়াপপুর হয়ে হামদাহ পর্যন্ত সাড়ে চার কিলোমিটার সড়কটি ১৮ ফুট থেকে ৩০ ফুটে উন্নীতকরণের লক্ষে জোড়া প্যাকেজে ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী ১৬ কোটি টাকায় ‘রিজিড পেভমেন্ট’ এবং ২৪ কোটি টাকায় ‘ফ্লেক্সিবল পেভমেন্ট’ নির্মাণের মূল কাজ বাগিয়ে নেয় ‘হাসান টেকনো’ ও ‘মাসুদ হাইটেক’ নামের দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে মূল ঠিকাদাররা দায়িত্ব এড়িয়ে পুরো কাজটি বেআইনিভাবে বিক্রি করে দেয় সাব-ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘এসআর ইন্টারপ্রাইজ’-এর মালিক বাবু পাটোয়ারীর হাতে। কাজের স্থানে সওজের উপ-সহকারী প্রকৌশলী হাসান আল মামুনের সার্বক্ষণিক তদারকিতে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও সাইটে তাঁর দেখা মেলেনি।

    স্থানীয় ক্ষুব্ধ বাসিন্দা আব্দুল হান্নান, ওলিয়ার রহমান ও সবুজ হোসেন অভিযোগ করে জানান, প্রথম দিন থেকেই এই মেগা প্রকল্পে ছলাকলা চলছে। সাববেজে বালি না দিয়ে মাটি ও আস্ত নিম্নমানের ইট বিছিয়ে রোলার চালিয়ে জনগণের ট্যাক্সের কোটি কোটি টাকা স্রেফ পানিতে ফেলা হচ্ছে। অনিয়মের তথ্য পেয়ে বিকেলেই ঝিনাইদহ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তুহিন আল মামুন এবং উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জিয়া উদ্দীন সরজমিনে উপস্থিত হন। কাজের নিম্নমান ও এক্সকাভেটর দিয়ে ইট তোলার লঙ্কাকাণ্ড দেখে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন তারা।

    ঝিনাইদহ সওজের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জিয়া উদ্দীন একে অত্যন্ত দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যা দেন। ঝিনাইদহ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তুহিন আল মামুন সাফ জানান, “আস্ত ইট ও মাটি দিয়ে সড়ক নির্মাণের কোনো সরকারি বিধান নেই। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে কাজ বন্ধ করে দিয়েছি। সিডিউল মেনে সঠিক গ্রেডের খোয়া ও বালি দিয়ে নতুনভাবে সাববেজ প্রস্তুত না করা পর্যন্ত ঠিকাদারের কোনো বিল ছাড় দেওয়া হবে না।”