প্রতিনিধি ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৩:৪০:১৩ প্রিন্ট সংস্করণ
বাণিজ্যিক রাজধানীর দক্ষিণ জনপদের অবহেলিত যোগাযোগ ব্যবস্থাকে চাঙ্গা করতে এক হাজার চারশ কোটি টাকার ওপরে যে বিশাল প্রকল্পের কাঠামো বিছানো হয়েছে, তার পরতে পরতে রয়েছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষতের ইতিহাস। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় পাস হওয়া ‘চট্টগ্রাম সড়ক জোনের আওতাধীন জেলা মহাসড়কসমূহ যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ (৩য় পর্যায়)’ প্রকল্পটি স্রেফ রাস্তা সংস্কার, পাহাড়ি বাঁক আর উপকূলীয় জনপদের মানুষের ভাগ্য বদলের বহুমাত্রিক পরিকল্পনা রুপ নিয়েছে।
সওজ সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম সড়ক জোনের ৭৮টি জেলা মহাসড়কের মোট ১ হাজার ৬৫৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মধ্যে এর আগে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৭টি সড়কের প্রায় ৩৯০ কিলোমিটারের চেহারা বদলানো হলেও, সিংহভাগ পথই পড়েছিল চরম অবহেলায়। আর সেই বঞ্চনার শিকার হওয়া ১৬টি জেলা মহাসড়কের ২৪৩ দশমিক ৫৬৮ কিলোমিটার অংশকে বেছে নেওয়া হয়েছে বর্তমান তৃতীয় ধাপের জন্য, যা পুরো জোনের প্রায় ১৫ শতাংশ।
এই প্রকল্পের খসড়া ঘাটলে চোখে পড়ে কারিগরি ও প্রকৌশলগত নানা গোলকধাঁধা। বরাদ্দকৃত ১ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে কেবল জোড়াতালি দিয়ে কাজ সারার সুযোগ রাখেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বরং প্রকল্পের ফ্রেমে বাঁধা হয়েছে এক সুনিপুণ কর্মপরিকল্পনা: যার ভেতরে রয়েছে ৪৮ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার সম্পূর্ণ পুনর্নির্মাণ, ১৪২ দশমিক ৬৩ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তকরণ, ১৬৩ দশমিক ৭২৪ কিলোমিটার মজবুতকরণ এবং ২৩১ দশমিক ৬১ কিলোমিটার এলাকায় নিখুঁত সারফেসিংয়ের কাজ। এর পাশাপাশি পাহাড়ি ঢল ও নিম্নাঞ্চলের জলাবদ্ধতার ছোবল থেকে পিচঢালা পথগুলোকে বাঁচাতে ১১ দশমিক ৯৫ কিলোমিটারজুড়ে বসানো হবে টেকসই রিজিড পেভমেন্ট বা কংক্রিটের আস্তরণ। বর্ষার পানিতে যেন সড়ক ধসে না যায়, সেজন্য রাখা হয়েছে ১৬৪টি কালভার্ট নির্মাণসহ আরসিসি প্লেট প্যালিসাইডিং, টো-ওয়াল, গাইডওয়াল এবং রিটেইনিং ওয়ালের সুব্যবস্থা।
তবে এই পুরো আয়োজনের পেছনের পথটি ছিল বেশ দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ। ‘সাসটেইনেবল রিসার্চ অ্যান্ড কনসালট্যান্সি লিমিটেড’ নামক একটি স্বতন্ত্র পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সুদীর্ঘ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চালিয়ে এটিকে কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে শতভাগ কার্যকর বলে সার্টিফিকেট নেওয়ার পরই কেবল ফাইলটি উঠেছিল একনেকের টেবিলে। রাউজান-নোয়াপাড়া, রাঙ্গুনিয়া-বাঙ্গাল হালিয়া, কুমিরা-সন্দ্বীপ, পটিয়া-আনোয়ারা কিংবা বান্দরবান-রোয়াংছড়ির মতো দুর্গম ও স্পর্শকাতর রুটগুলোকে নিরাপদ ও ব্যয়সাশ্রয়ী করার এই মহাযজ্ঞ এখন রয়েছে প্রাথমিক ধাপে।
চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইদুল ইসলামের জানায়, একনেকের আনুষ্ঠানিক সবুজ সংকেত পাওয়ার পর এখন শুরু হবে দরপত্র আহ্বানে ঠিকাদার নিয়োগের দরকষাকষি। ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে এই পুরো কর্মযজ্ঞ শেষ করার কড়া লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও, মাঠপর্যায়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের নানা ধোঁয়াশা পেরিয়ে পাহাড়ের মানুষের এই দুর্ভোগের মেঘ কত দ্রুত পুরোপুরি কেটে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
প্রকল্পের আওতায় থাকা রাউজান-নোয়াপাড়া, রাঙ্গুনিয়া-বাঙ্গাল হালিয়া, মরিয়মনগর-রানীরহাট, কুমিরা-সন্দ্বীপ, পটিয়া-আনোয়ারা, সিইউএফএল-হযরত মোহছেন আউলিয়া মাজার-জুইদণ্ডী ফেরিঘাট সড়ক, পটিয়া-চন্দনাইশ-বৈতলী, মইজ্জারটেক-বোয়ালখালী-কানুনগোপাড়া এবং ইলিশিয়া-ডেমুশিয়া-বাঘগুজারা-বেতুয়াবাজার সড়ক ছাড়াও রয়েছে কক্সবাজার ও পাহাড়ি তিন জেলার হোয়াইক্যং-শাপলাপুর, কুতুবদিয়া-আজম, বাঙ্গাল হালিয়া-রাজস্থলী, রানীরহাট-কাউখালী, খাগড়াছড়ি-পানছড়ি, বাঘাইহাট-মরিশা এবং বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়ক। এই ১৬টি সড়কের মাধ্যমে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির আন্তঃজেলা ও উপজেলাভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি, পর্যটন শিল্প এবং পণ্য পরিবহনে নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে বলে দৃঢ় আশা করা হচ্ছে।





