• ঢাকা, বাংলাদেশ    
  • শুক্রবার , ২৮ আগস্ট ২০২৬ ,১৬ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • প্রকৌশল সংবাদ

    খুলনা মেডিকেলে ২৭ লাখের ক্যানসার ভবন যেন ‘ভূতুড়ে ঘর’

      নিজস্ব প্রতিনিধি ২৮ আগস্ট ২০২৬ , ৮:৩৪:০৩ প্রিন্ট সংস্করণ

    ইট-পাথর, বালি-সিমেন্ট আর প্রশাসনিক কারচুপির এক দুর্ভেদ্য জালে বন্দি হয়ে পড়েছে খুলনা বিভাগের একমাত্র সরকারি ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্বাস্থ্যসেবার বুলি ফোটানো হলেও বাস্তবে গণপূর্তের তাসের ঘরে চাপা পড়েছে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বাংকার ও টয়লেট ভবন। প্রায় ২৭ লাখ টাকার সরকারি অর্থ লোপাট আর চরম খামখেয়ালিপনায় পরিণত হয়েছে আগাছাঘেরা তালাবদ্ধ ভূতুড়ে কমার্শিয়াল ফেসাদে।

    ভবনের চার দেওয়ালে গজিয়ে ওঠা বৃহদাকার ফাটল আর খসে পড়া প্লাস্টার নকশাবিহীন নিচুমানের নির্মাণ আর সরকারি রাজকোষের টাকা হরিলুটের চিত্রই ফুটিয়ে তুলেছে খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১।

    অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৭ সালে এই বিতর্কিত বাংকার ও টয়লেট ভবনের ভিত্তি প্রস্তর যখন স্থাপিত হয়, তখন খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলীর মসনদে আসীন ছিলেন বিতর্কিত প্রকৌশলী মোহাঃ জাকির হোসেন (কার্যকাল: ২১ অক্টোবর ২০১৫ – ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮)। তাঁর মেয়াদকালে সরকারি ক্রয় বিধিমালা ও নির্মাণের গুণগত মানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রকল্পের যে ভঙ্গুর ভিত রচিত হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় পরবর্তী নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল (২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ – ০৮ এপ্রিল ২০১৯) চোখ বন্ধ করে রাজকোষের টাকা ছাড় দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। আর এই তিন স্তম্ভের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ লতিফুল ইসলামের (০৯ এপ্রিল ২০১৯ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত) হাত ধরে, যিনি ২০২১ সালের ৫ এপ্রিল সম্পূর্ণ ব্যবহারের অযোগ্য, দেয়াল ও ছাদে মরণফাটল ধরা ভবনটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ঘাড়ে হস্তান্তরের দাপ্তরিক সাফাই গেড়ে বিদায় হন।

    সরেজমিনে দেখা যায়, আধুনিক লিনিয়ার এক্সিলারেটর মেশিন বসানোর সেই বাংকার আর পুরুষ-নারীর পৃথক ১০টি টয়লেটের দরজায় ঝুলছে মোটা মোটা তালা। তালাবদ্ধ ঘরের ভেতরে অব্যবহৃত অবস্থাতেই নষ্টের মুখে বহুমূল্যের স্যানিটারি সরঞ্জাম, যার সিংহভাগই আবার চোর চক্রের সহায়তায় উধাও হয়ে গেছে। ক্যানসার ইউনিটের প্রধান ডা. মো. মুকিতুল হুদা ও হাসপাতালে আসা দূর-দূরান্তের ভুক্তভোগী রোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, একটি টয়লেটের জন্য হাহাকার করতে হলেও চোখের সামনে কোটি টাকার সরকারি সম্পদ শুধু প্রকৌশলীদের পকেট ভরার মহোৎসবে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।

    গণপূর্তের সাবেক এক প্রধান প্রকৌশলী প্রকৌশল সংবাদকে বলেন, পাশের ভবন নির্মাণের অজুহাত তুলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হলেও মূল গলদ ছিল মাটির বৈশিষ্ট্য না মেনে করা নির্মাণত্রুটি ও হরিলুটের উদ্দেশ্যে প্রণীত ভুয়া প্রাক্কলনে। তিনি আরও বলেন, এহেন মারাত্মক অনিয়ম, রাজকোষ তছরুপ ও জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলার পর কোনো জবাবদিহিতার আওতায় তো আসাই হয়নি, বরং অলৌকিক জাদুবলে সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাঃ জাকির হোসেন পদোন্নতি বাগিয়ে বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা ও চট্টগ্রাম সার্কেলের মতো সর্বময় ক্ষমতার কেন্দ্রে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন!

    খুলনা মেডিকেল হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক ডা. কাজী মো. আইনুল ইসলামও স্বীকার করেছেন, আগের কোনো ফাইল বা স্পষ্ট নথিপত্রই রেখে যাননি সেই আমলের গণপূর্তের অসাধু কুশীলবরা। এই চরম অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার পেছনে যে গোলকধাঁধা সিন্ডিকেটের হাত রয়েছে, সেই জাকির-নজরুল-লতিফুলদের হরিলুটের লাগাম টানতে কেন এখনো পর্যন্ত স্বাধীন কারিগরি তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, তা নিয়ে ফুঁসে উঠছেন খুলনা অঞ্চলের সাধারণ মানুষ।