• ঢাকা, বাংলাদেশ    
  • সোমবার , ৩০ জুন ২০২৫ ,২০শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • প্রকৌশল সংবাদ

    দেবীগঞ্জের প্রকৌশলী শাহরিয়ারের অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ

      নিজস্ব প্রতিনিধি ৩০ জুন ২০২৫ , ৫:১৫:৩৯ প্রিন্ট সংস্করণ

    পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী শাহরিয়ার ইসলাম শাকিলের বিরুদ্ধে সরকারের বরাদ্দকৃত প্রকল্পের অর্থ লোপাট, ভুয়া ভাউচার সৃজন ও কাজ না করে বিল উত্তোলনের গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) একটি অভ্যন্তরীণ তদন্তে এ ভয়াবহ চিত্র স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে, যার প্রতিটি পাতায় ফুটে উঠেছে এক চরম দুর্নীতির খণ্ডচিত্র।

    ২০২৩–২৪ অর্থবছরের বার্ষিক ও রাজস্ব উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় আরএফকিউ পদ্ধতিতে অনুমোদিত একাধিক প্রকল্পে বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থ সরাসরি লোপাট করা হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, দেবীগঞ্জ উপজেলা শিল্পকলা একাডেমিতে সাউন্ড সিস্টেম ও বাদ্যযন্ত্র ক্রয়ের জন্য বরাদ্দকৃত ৫ লাখ টাকার কোনো হদিস মেলেনি। যেখানে সরঞ্জাম থাকার কথা, সেখানে পাওয়া গেছে একটি জানালাবিহীন, বন্ধ, পরিত্যক্ত ঘর। একইভাবে উপজেলা পরিষদের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ক্লাবেও বরাদ্দকৃত আসবাবপত্রের কোনো অস্তিত্ব নেই। বরং ক্লাবটি গত দুই বছর ধরে তালাবদ্ধ, কার্যত নিষ্ক্রিয়। ক্লাবের সভাপতি ও সম্পাদক সরাসরি কোনো বরাদ্দ পাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

    শুধু তাই নয়, তদন্তে জানা যায়, উপজেলার ২১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণের ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে ১৪টি স্কুল ঘুরে দেখা গেছে, মাত্র ৭টিতে কিছু সামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে, ৩টিতে আংশিকভাবে, আর ৪টি প্রতিষ্ঠানে কিছুই দেওয়া হয়নি। এমনকি বেশ কিছু বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রকল্প কিংবা বরাদ্দ সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না। অর্থাৎ সম্পূর্ণ কাল্পনিক বিতরণের ভিত্তিতে বিল উত্তোলন করে গৃহস্থালি উন্নয়ন নয়, বরং ব্যক্তিগত পকেট ভারী করা হয়েছে।

    প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ ও রহস্যজনক। “মেসার্স অন্যন্যা ট্রেডার্স”-এর মালিক দেলোয়ার হোসেন দেলু অকপটে স্বীকার করেন, প্রকৌশলী শাহরিয়ার তার লাইসেন্স ব্যবহার করেছেন। প্রকল্প বাস্তবায়ন বা মালামাল সরবরাহ বিষয়ে তিনি কোনো দায়িত্ব নেননি, বরং জানিয়েছেন, এতে তার কোনো কমিশনও ছিল না! অপরদিকে, ক্লাবের আসবাবপত্র ক্রয়ের ঠিকাদার “মেসার্স প্রাপ্তী ট্রেডার্স”-এর মালিক রফিকুল ইসলাম প্রকল্প সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করে পরবর্তীতে জানাবেন বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন।

    উল্লেখ্য, এই ভয়াবহ অনিয়ম প্রথম গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে এলজিইডি পঞ্চগড়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ জামান তা আমলে নিয়ে সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মতিনকে তদন্তের দায়িত্ব দেন। তদন্তে একের পর এক প্রকল্পে চরম অনিয়ম, ভুয়া বিল, কাজ না করেই টাকা উত্তোলন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে সরাসরি অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মেলে।

    স্থানীয় সচেতন মহল এই দুর্নীতিকে কোনো একক ব্যক্তির অপরাধ বলে মানতে রাজি নয়। তাদের দাবি, এই অনিয়মের পেছনে রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যেখানে উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তার পাশাপাশি জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী মহলও জড়িত থাকতে পারে। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, শাহরিয়ার ইসলাম শাকিল কি আদতেই একা এই বিশাল দুর্নীতির মহোৎসব আয়োজন করেছেন, না কি তিনি ছিলেন শুধুমাত্র ফ্রন্টম্যান?

    স্থানীয় জনগণ দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকৌশলী শাহরিয়ার ইসলাম শাকিলকে প্রত্যাহার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। সেই সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়ায় জড়িত সিন্ডিকেট চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে উর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানা গেছে।