নিজস্ব প্রতিনিধি ২৪ আগস্ট ২০২৬ , ৪:১০:৪২ প্রিন্ট সংস্করণ
ক্ষমতার মসনদ বদলেছে, পতাকার রং বদলেছে, বদলেছে মন্ত্রণালয়ের কর্তা-ব্যক্তিও; কিন্তু গণপূর্তের ক্ষমতার অলিন্দে মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর উত্থানের কাহিনি যেন কোনো পালাবদলেই থামেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে শুধু আশ্রয়ের ঠিকানা, পাল্টেছে প্রভাবের ভাষা। একসময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পরিচয়, পরে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন সিন্ডিকেটের সঙ্গে সখ্য এমন অভিযোগই এখন গণপূর্ত অধিদপ্তরের অন্দরমহলে ঘুরপাক খাচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রিন সিটি প্রকল্পের কার্যাদেশ থেকে বহুল আলোচিত বালিশ-পর্দা কাণ্ড, সেখান থেকে প্রশাসনিক পদোন্নতি এবং শেষ পর্যন্ত গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ারে আরোহণ খালেকুজ্জামান চৌধুরীর দীর্ঘ ক্যারিয়ার যেন আজব গোলকধাঁধার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ফরিদপুরের প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পরিচয়কে প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেন খালেকুজ্জামান। প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে ‘ফুফু’ এবং সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মো. আব্দুর রহমানকে নিকটাত্মীয় হিসেবে পরিচয় দেওয়ার কথাও বিভিন্ন মহলে আলোচিত ছিল বলে দাবি তাদের।
খোদ এই প্রধান প্রকৌশলী সম্পর্কে অনুসন্ধানে সরেজমিনে খোঁজ-খবর নিলে বারবার সামনে আসে পাবনা গণপূর্ত বিভাগ। ২০১৪ সালের শেষদিকে থেকে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী। ঠিক সেই সময়েই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রিন সিটি আবাসিক প্রকল্পে একের পর এক বহুতল ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, তার দায়িত্বকালেই প্রকল্পটির বড় অঙ্কের নির্মাণকাজ নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, সাজিন ও তমা কনস্ট্রাকশনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম এ ক্ষেত্রে আলোচনায় আসে।
তারা আরও জানায়, এসব প্রতিষ্ঠানের কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে খালেকুজ্জামানের প্রশাসনিক অবস্থান ও প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তবে অভিযোগের প্রকৃত সত্য বের করতে হলে আবেগ নয়, দরকার নথির ময়নাতদন্ত। কোন টেন্ডারে কারা অংশ নিয়েছিল, কার দরপত্র কত ছিল, মূল্যায়ন কমিটি কী সুপারিশ করেছিল, কার্যাদেশ কোন যুক্তিতে দেওয়া হয়েছিল, কাজের বিপরীতে কত টাকা পরিশোধ হয়েছে, এসব তথ্য পাশাপাশি রাখলেই বোঝা সম্ভব হবে, রূপপুরের কাজগুলো ছিল স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার ফল, নাকি অদৃশ্য কোনো সমীকরণের ফসল।
রূপপুরের সেই প্রকল্পটি শেষ হওয়ার আগেই পরিণত হয় জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে। ২০১৯ সালে গ্রিন সিটি আবাসিক প্রকল্পের আসবাবপত্র ও পর্দা কেনাকাটায় অস্বাভাবিক ব্যয়ের অভিযোগ প্রকাশ্যে এলে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। বালিশ, পর্দাসহ বিভিন্ন সামগ্রী কেনার অস্বাভাবিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে প্রকল্পের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও তদারকির সঙ্গে যুক্ত প্রকৌশলীদের ভূমিকা নিয়ে। সূত্র বলছে, ওই সময় খালেকুজ্জামান চৌধুরী রাজশাহী গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে ছিলেন। ফলে প্রকল্পের প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে তার অবস্থানও আলোচনায় আসে।
অভিযোগ রয়েছে, রূপপুর প্রকল্পের অনিয়মের দায় নির্ধারণের সময় মাঠপর্যায়ের কয়েকজন প্রকৌশলীর ওপর দায়ের বড় অংশ চাপিয়ে দেওয়া হলেও প্রভাবশালী পর্যায়ের প্রকৌশলীরা তুলনামূলকভাবে নিরাপদে থেকে যান। এমনকি তার ব্যাচমেট প্রকৌশলী জিল্লুর রহমানকে রক্ষার অভিযোগও রয়েছে।
রূপপুর প্রকল্প যখন বিতর্কের আগুনে পুড়ছে, তখনও তার প্রশাসনিক ক্যারিয়ারের গতি থেমে থাকেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি আরও গুরুত্বপূর্ণ পদে উঠেছেন। ১৯৯৯ সালে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী, ২০১২ সালে নির্বাহী প্রকৌশলী, ২০১৯ সালে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব ঠিক এভাবেই ধাপে ধাপে তিনি পৌঁছে যান অধিদপ্তরের সর্বোচ্চ প্রকৌশলী পদে।
সরকার পরিবর্তনের পর এই উত্থানই নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ব্যাপক রদবদল শুরু হয়। গণপূর্ত অধিদপ্তরেও বদলি-পদায়নের ধারাবাহিকতায় তৈরি হয় নতুন সমীকরণ। সেই সময় শামীম আখতার প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে তাকে সরিয়ে খালেকুজ্জামান চৌধুরী প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে আসেন। গণপূর্তের একাধিক প্রকৌশলী বলেন, জ্যেষ্ঠতার ক্রমে তার সামনে থাকা একাধিক প্রকৌশলীকে পেছনে ফেলে এই পদে আসার পেছনে প্রশাসনিক যোগ্যতার পাশাপাশি রাজনৈতিক তদবিরও কাজ করেছে।
রাজনীতির বাতাস বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে খালেকুজ্জামানের কথিত যোগাযোগের বৃত্তও বদলেছে, এমন অভিযোগও রয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে সাজেদা চৌধুরীকে ‘ফুফু’ পরিচয় দেওয়ার যে আলোচনা ছিল, পরবর্তী সময়ে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াত-ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে আত্মীয়তার নতুন সূত্র তৈরির অভিযোগও সামনে এসেছে। ফরিদপুরের নগরকান্দা ও আশপাশের এলাকার স্থানীয় সম্পর্ককে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ উঠেছে, গণপূর্তের এই প্রধান প্রকৌশলী নিজের ভাই ও ভাগিনাসহ ঘনিষ্ঠ স্বজনদের মাধ্যমে টেন্ডার ও ডেভেলপার ব্যবসায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, তার স্ত্রী ও তিন কন্যা অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করেন। তাকে ঘিরে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগও উঠেছে। আরও জানা যায়, প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে স্টাফ অফিসার পদায়ন নিয়েও গণপূর্তের ভেতরে নানা আলোচনা রয়েছে। একজন নারী প্রকৌশলীকে ওই দায়িত্ব দেওয়ার পর তাকে ঘিরে ব্যক্তিগত সম্পর্কের নানা গুঞ্জন ছড়িয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে এবিষয়ে জানতে গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
চলবে…




