প্রতিনিধি ২৯ মে ২০২৫ , ১১:৫৬:১৬ প্রিন্ট সংস্করণ
এম এইচ মুন্না: চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা এলজিইডির সাবেক হিসাব রক্ষক শাহাবুদ্দিন আহমেদ তার কর্মজীবনের পূর্ণাঙ্গ অধ্যায় সম্পন্ন করে চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রীয় চাকরি বিধিমালার আলোকে দীর্ঘকাল সরকারি দায়িত্ব পালনের পর তিনি স্বাভাবিক নিয়মে পেনশন ও মাসিক পেনশন ভোগের আইনি অধিকার লাভ করেন। কিন্তু সেই অধিকার এখন প্রতিপাদিত হচ্ছে এক নিপুণ প্রশাসনিক জটিলতার প্রতিচ্ছবিতে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শাহাবুদ্দিন আহমেদের পেনশন সংক্রান্ত সকল আনুষঙ্গিক কাগজপত্র, হিসাবনিকাশ এবং ফাইনাল স্যাটেলমেন্ট যথাযথ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হলেও এখন পর্যন্ত তার মাসিক পেনশন মঞ্জুরী আদেশে চূড়ান্ত স্বাক্ষর করেননি চুয়াডাঙ্গা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম। ফলে, নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী পেনশনের টাকা ট্রেজারি থেকে ছাড় হয়নি, এবং প্রতিমাসের প্রাপ্য ভাতাটুকুও অনিশ্চয়তার ঘোরে হারিয়ে গেছে।
একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীর জন্য পেনশন এবং মাসিক পেনশন শুধু অবলম্বন নয়, বরং তা একটি সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক অধিকার—যার মাধ্যমে জীবনের শেষ প্রান্তে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার কথা। পেনশন বলতে বোঝায় সরকারি চাকরির নির্দিষ্ট মেয়াদ পূর্ণ করে অবসরে যাওয়া কোনো কর্মচারীকে সরকার কর্তৃক প্রদত্ত এককালীন ও মাসিক আর্থিক সুবিধা। এর মধ্যে ‘গ্র্যাচুইটি’ অর্থাৎ এককালীন পেনশন এবং ‘মাসিক পেনশন’ বা ‘পেনশন মঞ্জুরী আদেশ’—দুটিই থাকে। মাসিক পেনশন মঞ্জুরী আদেশে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রধান কর্মকর্তার স্বাক্ষর অত্যাবশ্যকীয়, যা ব্যতীত হিসাব মহানিয়ন্ত্রক (CGA) কার্যালয় তা কার্যকর করতে পারে না।
শাহাবুদ্দিন আহমেদ নিয়মিতভাবে নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরে গিয়ে স্বাক্ষর চেয়ে অপেক্ষা করছেন দিনের পর দিন। তার আশা ছিল, অবসরের পরে পাওয়া টাকায় তিনি জীবনের একটি বড় স্বপ্ন—পবিত্র হজ পালন করতে পারবেন। কিন্তু এখন হজের ভিসা তো দূরের কথা, মাসিক বাজার খরচ চালাতেই তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, হয়তো তিনি কিছু ঋণে জর্জরিত আছেন—যা মেটানোর জন্য পেনশনের টাকাটাই ছিল শেষ ভরসা।
এই ধরণের আচরণ শুধু একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীর প্রতি অবিচার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রতি চরম উদাসীনতারও দৃষ্টান্ত। একদিকে পেনশনের অর্থে তার হজযাত্রার স্বপ্ন প্রতিদিন মরে যাচ্ছে, অন্যদিকে দপ্তরের নির্বিকার আচরণ সমাজের মানবিক বিবেচনাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত চূড়ান্ত স্বাক্ষর হয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র। প্রশ্ন উঠেছে, কেন এই দীর্ঘসূত্রিতা? কেন একজন প্রাপ্যভোগীকে দিনের পর দিন ঘুরপাক খেতে হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি এখনও।
পেনশনের টাকা দেরি হওয়া মানেই একজন মানুষকে তার প্রাপ্য নাগরিক সম্মান থেকে বঞ্চিত করা। রাষ্ট্র যদি নিজস্ব কর্মচারীর প্রাপ্য আদায়ে গড়িমসি করে, তবে সেটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়—একটি নৈতিক ও মানবিক ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ।
তবে শাহাবুদ্দিন আহমেদ এখনো আশা ছাড়েননি। তার বিশ্বাস, হয়তো কোনো এক দিন নির্বাহী প্রকৌশলীর কলম চলবে, হয়তো কোনো এক সকাল তার জন্য বয়ে আনবে সেই বহুপ্রতীক্ষিত স্বস্তি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—কবে?











