• ঢাকা, বাংলাদেশ    
  • বুধবার , ৪ নভেম্বর ২০২৬ ,২০শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • অপরাধ

    রাজস্বে লুটের রাজত্ব: কাস্টমস কর্মকর্তা সাকিবের হরিলুট

      এম এইচ মুন্না  ৪ নভেম্বর ২০২৬ , ৯:৩১:৩০ প্রিন্ট সংস্করণ

    রাষ্ট্রের রাজস্ব পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব যাঁর হাতে, তাঁর বিরুদ্ধেই উঠেছে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ করে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ। পণ্যের ঘোষণায় গরমিল, শুল্কায়নে অস্বাভাবিক ছাড়, ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের ব্যবহার এবং আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছেন ঢাকা কাস্টম হাউসের কুরিয়ার ইউনিটের সহকারী কমিশনার সাকিব আনাম খান। বিসিএস ৪০তম ব্যাচের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, কুরিয়ার ইউনিটে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই একের পর এক বিতর্কিত পণ্য চালান খালাসের সুযোগ তৈরি হয়েছে তাঁর মাধ্যমে।

    সবচেয়ে বড় চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলছে ‘ফুলএভার বিডি লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের চালানকে কেন্দ্র করে। গত ২৩ আগস্ট ঢাকা কাস্টম হাউসের কুরিয়ার ইউনিট দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি একটি পণ্য চালান আমদানি করে (বিল অব এন্ট্রি নম্বর: সি-৯৯২৬২৩)। কাগজ বা সাধারণ ঘোষণা দিয়ে পণ্য আনা হলেও বাস্তবে ওই চালানে ছিল ‘আরএফ লেভেল’। কিন্তু পণ্যের প্রকৃত পরিচয় ও শুল্কযোগ্যতা যাচাই না করে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা শুল্ক-কর নির্ধারণ করে চালানটি খালাসের অনুমতি দেওয়া হয়। পরবর্তী তদন্তে একই চালানের বিপরীতে সরকারের প্রায় ৭৬ লাখ টাকা শুল্ক-কর পাওনা থাকার তথ্য বেরিয়ে আসে। অথচ তার আগেই পণ্য চলে যায় আমদানিকারকের দখলে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষ মামলা করলেও মূল হোতাদের যোগসাজশ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।

    এছাড়াও নমুনা পণ্যের জন্য নির্ধারিত কুরিয়ার ব্যবস্থাকে বাণিজ্যিক পণ্য খালাসের বিকল্প পথে রূপান্তর করার অভিযোগ উঠেছে সাকিব আনাম খানের বিরুদ্ধে। সীমিত পরিসরে নমুনা পণ্য আমদানির সুযোগ থাকলেও এখানে বাণিজ্যিক আমদানির প্রবণতা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়। সূত্রের দাবি, একজন সাধারণ শ্রমিকের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে মাত্র পাঁচ দিনে প্রায় ৪০টি বিল অব এন্ট্রির পণ্য চালান বেআইনিভাবে খালাস করা হয়েছে। ‘ডেল্টা কার্গো মিডিয়া’র নামে এসব চালানের মধ্যে রয়েছে, ১০৯৯৬৯৫, ১০৯৯৭৫৬, ১০৯৯৭৪৫, ১০৮৮৭৩০, ১০৮৮৭০২, ১০৮৮৭১২, ১০৮৪৬৪২, ১০৮৪৫৪৮, ১০৮৩৩৪৫, ১০৮৩৩৩৯, ১০৮৩৩৫৪, ১০৮৩৩৫১, ১০৭৯৬৯২, ১০৮০৯৩৭, ১০৭৮৭১৮ ও ১০৮০৯৮২সহ প্রায় ৪০টি বিল অব এন্ট্রি। একজন শ্রমিকের পরিচয়পত্র ব্যবহার করে এত অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক চালান খালাস হওয়ায় আমদানি ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও পরিচয় যাচাই প্রক্রিয়া বড় ধরনের ধোঁয়াশার সৃষ্টি করেছে।

    অভিযোগ উঠেছে, সাকিব আনাম খানের দায়িত্ব গ্রহণের পর কুরিয়ার ইউনিটে অন্তত দুটি সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই সিন্ডিকেটগুলো বিভিন্ন সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে তাঁর মাধ্যমে মিথ্যা ঘোষণায় বন্ড সুবিধায় আনা ফেব্রিক্স থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্য অবলীলায় খালাস করে নিয়ে গেছে। তাঁর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ইতিহাস নতুন নয়। এর আগে রাজশাহী ভ্যাট কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনের সময় ঈশ্বরদী ইপিজেডে পদায়ন পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে হয়রানি করে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ওঠায় মাত্র দুই মাসের মাথায় তৎকালীন কমিশনার তাঁকে ওই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন। এমনকি এর আগে ঢাকা কাস্টম হাউসের অ্যাসেসমেন্ট গ্রুপে দায়িত্ব পালনকালেও ঘুষ বা সুবিধা না পেলে ইচ্ছাকৃতভাবে ফাইল আটকে রেখে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সর্বশেষ এসব গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের জেরে গত বৃহস্পতিবার সহকারী কমিশনার সাকিব আনাম খানকে কুরিয়ার ইউনিট থেকে সরিয়ে অন্য একটি শাখায় বদলি করা হয়েছে।

    এ বিষয়ে ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার রইচ উদ্দিন খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “কুরিয়ার ইউনিটে একজন আমদানিকারক মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য চালান খালাস করেছেন। কাস্টম হাউসের তদন্তে সেখানে আরএফ লেভেল পাওয়া গেছে, যার মাধ্যমে সরকারের প্রায় ৭৬ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে এবং তাদের পরবর্তী পণ্য চালান অবজারভেশনে রাখা হয়েছে।” তবে সুনির্দিষ্ট এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত সহকারী কমিশনার সাকিব আনাম খানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।