প্রতিনিধি ১৯ মে ২০২৫ , ২:৫৪:২০ প্রিন্ট সংস্করণ
—এম এইচ মুন্না
ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক অভিজাতদের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা অদৃশ্য সিন্ডিকেটের হাতছানিতে বারবার আলোচিত হয়ে উঠেছে চট্টগ্রামভিত্তিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স (প্রা.) লিমিটেড। ক্ষমতার রদবদলের পরপরই, নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তি (এলজিইডি), সড়ক ও জনপথ (সওজ), পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং অন্যান্য দপ্তর থেকে ৮ মাসেই ২৮০টি প্রকল্পের কাজ হাতিয়ে নেয়, যার আর্থিক পরিমাণ ৮৩৬ কোটি টাকা। এ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও ধারা দেখে সংশ্লিষ্ট মহলে তৈরি হয়েছে ব্যাপক গুঞ্জন, জন্ম নিয়েছে নানা প্রশ্ন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ঠিকাদারি জগতে আলোচিত জি কে শামীমের ধূসর ছায়াকে ছাপিয়ে এখন দৃশ্যপটে এসেছেন ইউনুস ব্রাদার্সের কর্ণধাররা। যাদের বিরুদ্ধে কাজ না করেও বিল উত্তোলন, প্রকল্প সাব-কন্ট্রাক্টে বিক্রয়, এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে টেন্ডার দখলের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই প্রচ্ছন্নভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রকল্প নেয়ার আগেই জেলা-জেলায় তৈরি থাকে ‘প্রস্তত ঠিকাদার’—যারা নির্ধারিত অর্থের বিনিময়ে ইউনুস ব্রাদার্সের লাইসেন্স ব্যবহার করে দরপত্রে অংশগ্রহণ করে।
বিশেষ করে পিরোজপুরের সাবেক সংসদ-সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজের গড়ে তোলা প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ছায়া থেকে ইউনুস ব্রাদার্স কখনোই বের হয়নি—বরং সেই ছায়াতেই আরও বর্ধিত হয়ে চলেছে। এলজিইডির পিরোজপুর নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ৯৭ কোটি টাকার কাজের বরাদ্দ পাওয়ার পর, এর মধ্যে ৩৮ কোটি টাকার অগ্রিম বিল উত্তোলন হলেও বাস্তবে কাজের অগ্রগতি ছিল না বললেই চলে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে এলজিইডি, সওজ, পাউবো, বিএডিসি, ইইডি, পিডব্লিউডি, খাদ্য অধিদপ্তর এবং রুরাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেটিভ মিলিয়ে মোট ২৮০টি প্রকল্প লাভ করেছে ইউনুস ব্রাদার্স। এর মধ্যে শুধু এলজিইডি থেকেই এসেছে ১৭৩টি কাজ, যার আর্থিক পরিমাণ ৬০৩ কোটি টাকা। সওজ থেকে ৮১টি কাজ, পাউবো থেকে ১৫টি, অন্য দপ্তরগুলো মিলিয়ে বাকিগুলো।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা যায়, ২৯ এপ্রিল একদিনেই সওজ ও পাউবো থেকে ১১টি কাজ পেয়েছে ইউনুস ব্রাদার্স। একইভাবে, এপ্রিল মাসজুড়ে দেশের নানা জেলায় কাজ বরাদ্দ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি—যেমন সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর, মাদারীপুর, রাজশাহী, গোপালগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ভোলা, হবিগঞ্জ, জামালপুর প্রভৃতি।
তবে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো—একটি প্রতিষ্ঠান এত বিপুল সংখ্যক কাজ হাতে পেয়েও সময়সীমা ও গুণগত মান বজায় রেখে বাস্তবায়ন করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে প্রকৌশলী মহলেও সন্দেহ দানা বেঁধেছে। আবার সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ দিয়ে দায় ঝেড়ে ফেললে মূল লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি, প্রকল্পের গুণগত মান—সবই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে জানতে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ মিয়াকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অন্যদিকে, মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্সের ডিএমডি মোহাম্মদ ইমরান হোসেন দাবি করেন, “আমাদের কোম্পানি ৫০ বছরের পুরোনো। আইন মেনে কাজ করি। কাজ না করে বিল তোলার মতো কৌশল আমাদের জানা নেই। এক শ্রেণির মহল অপপ্রচারে মেতেছে।”
তবে পিরোজপুরে এলজিইডির অধীনে ১৬৪৭ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় দুদকের তদন্ত ও মামলার বিষয়টি ধামাচাপা পড়েনি। তদন্তে মহারাজ, তার ভাই ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের যোগসাজশ স্পষ্টভাবে উঠে আসে, এবং ইউনুস ব্রাদার্সের নামও সেখানে উল্লেখ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, ই-জিপি টেন্ডার ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক ‘ম্যানেজমেন্ট’-এর জোরে এত বিপুল পরিমাণ কাজ পাওয়ার ঘটনা নৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং আর্থিক স্বচ্ছতার ওপর এক ধরনের চপেটাঘাত। পরিস্থিতির যথাযথ তদন্ত এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।










