এম এইচ মুন্না ১১ জুন ২০২৬ , ১১:২৮:৫৬ প্রিন্ট সংস্করণ
জাতীয় সংসদ ভবন রাষ্ট্রের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও সর্বোচ্চ আইনসভা। যেখানে আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, সেই ভবনের অভ্যন্তরীণ আসবাবপত্র, ইন্টেরিয়র এবং বিশেষায়িত কাঠের অবকাঠামো নির্মাণের মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব এখন কার হাতে? অনুসন্ধান বলছে, নারায়ণগঞ্জ আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত নিয়ন্ত্রক, ‘হোন্ডা বাহিনী’র গডফাদার এবং স্বৈরাচারের দোসর আলী হায়দার শামীম ওরফে ‘পিজ্জা শামীম’-এর পুত্র জুবায়ের বিন হায়দার বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাঠের কারখানা সার্কেল-৩-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে এই জাতীয় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসীন।
শুধু তাই নয়, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী র আ ক ম ওবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরী এবং জাকারিয়া তাহের সুমনের আশীর্বাদপুষ্ট এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উঠেছে কোটি কোটি টাকার টেন্ডারবাজি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং জাতীয় সংসদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মতো গুরুতর অভিযোগ। গণপূর্তের ভেতরে অনেকেই এই সেক্টরকে ‘নীরব স্বর্ণখনি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনের পর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন ওবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরী। এই মুক্তাদির চৌধুরী হলেন ১৯৯৬ সালের বিতর্কিত ‘জনতার মঞ্চ’ গঠনের প্রধান সংগঠক ও মূল খলনায়ক, যিনি সেসময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপি সরকারকে গভীর সংকটে ফেলেছিলেন।
১৯৯৬ সালের ২৩ মার্চ ওবায়দুল মুক্তাদির তৎকালীন মেয়র হানিফকে দিয়ে ঘোষণা করান যে, গণপূর্ত, ওয়াসা, ডেসা, রাজউকসহ সকল সেবা প্রতিষ্ঠান তার নির্দেশে চলবে। ওই একই দিনে গণপূর্তের কিছু উগ্র কর্মকর্তাকে দিয়ে নির্বাচিত দুই সংসদ সদস্য অধ্যাপক রেজাউল করিম ও শাহজাহান ওমরকে মারধর করানো হয়। তৎকালীন এক প্রতি মন্ত্রীকে সচিবালয়ের লিফটে উঠতে না দিয়ে অপদস্থ করে গণপূর্তের লিফটম্যানরা।
১৯৯৬ সালের ২৮ মার্চ গণপূর্তের কতিপয় বিপথগামী প্রকৌশলী তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বাসভবনের গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ড ঘটায়।
২০২৪ সালের ১৩ জানুয়ারি টুঙ্গিপাড়ায় শেখ হাসিনার দেওয়া সেই গোপন নির্দেশনায় জানা যায়, “আমাদের হাতে সময় ছয় মাস, প্রশাসন এমনভাবে ঠিক করেন যেন ক্ষমতা ছাড়তে হলেও দ্রুত ফিরে আসতে পারি”** বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই ওবায়দুল মুক্তাদিরের অনুসারী ও আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের গণপূর্তের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়। প্রকৌশলী জুবায়ের বিন হায়দার তেমনই একজন সুবিধাভোগী, যিনি কোটি টাকার রফাদফার মাধ্যমে এই স্পর্শকাতর পোস্টিং পেয়েছেন। সচেতন মহল আশঙ্কা করছেন, এই সিন্ডিকেট যেকোনো সময় আবার ‘জনতার মঞ্চ’র মতো রাষ্ট্রবিরোধী নাশকতা ঘটিয়ে জাতীয় সংসদের নিরাপত্তা বিপন্ন করতে পারে।
নির্বাহী প্রকৌশলী জুবায়ের বিন হায়দারের ক্ষমতার মূল উৎস তার পিতা আলী হায়দার শামীম ওরফে পিজ্জা শামীম। নারায়ণগঞ্জ শহরের একজন চিহ্নিত ভূমিদস্যু, চাঁদাবাজ এবং শহরের ত্রাস হিসেবে পরিচিত ‘হোন্ডা বাহিনী’-এর অন্যতম মূল হোতা তিনি। কুখ্যাত সন্ত্রাসী আজমেরী ওসমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই পিজ্জা শামীমের অপরাধের খতিয়ান গা শিউরে ওঠার মতো:
২০২৩ সালের ১৬ মার্চ বন্দর উপজেলার ফরাজিকান্দায় বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসিম ওসমান তৃতীয় সেতু সংলগ্ন একটি অস্থায়ী বাজার ও জমি দখলের উদ্দেশ্যে পিজ্জা শামীমের নেতৃত্বে শতাধিক সন্ত্রাসী মোটরসাইকেল বহর নিয়ে ফিল্মি স্টাইলে গুলিবর্ষণ ও তাণ্ডব চালায়। এই হামলায় গুলিবিদ্ধ মইনুল হক পারভেজ চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫ এপ্রিল মারা যান।
নারায়ণগঞ্জ শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কের ‘একতা সাইন’-এর গলির একটি ভবনের তিন তলায় গড়ে তোলা হয়েছিল পিজ্জা শামীমের নিজস্ব টর্চার সেল। সেখানে কিশোর গ্যাং, মাদক ব্যবসায়ী ও চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণ করা হতো এবং চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সাধারণ মানুষকে এনে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো।
পিতার অপরাধের কালো টাকা আর মন্ত্রীর রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নির্বাহী প্রকৌশলী জুবায়ের বিন হায়দার গণপূর্তে কায়েম করেছেন একচ্ছত্র রাজত্ব। আসবাবপত্র, ইন্টেরিয়র এবং বিশেষায়িত কাঠের কাজের এই খাতে প্রতি বছর ব্যয় হয় বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থ।
অভিযোগ রয়েছে, গত দেড় দশকে এই খাতের বড় বড় প্রকল্পের সুবিধা মূলত সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই ঘুরপাক খেয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২৮৫ কোটি টাকার হাসপাতাল ফার্নিচার ক্রয় প্রকল্প নিয়েও উঠেছে নানা দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ। নতুন কোনো যোগ্য ঠিকাদারকে এখানে কাজ করতে দেওয়া হয় না।
ইতিমধ্যে জুবায়ের বিন হায়দারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। তার অর্জিত দৃশ্যমান কিছু অবৈধ সম্পদের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো, রাজধানীতে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, ৩৩/সি আসাদ এভিনিউ, মোহাম্মদপুর, ঢাকায় প্রায় ২২০০ বর্গফুট।
বিশাল প্লট, র্বাচল নতুন শহরে প্রায় ২০ কাঠার।
নামে-বেনামে জমি, ইটনা, কিশোরগঞ্জল বিপুল পরিমাণ কৃষি ও অকৃষি জমি।
একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের জাতীয় সংসদ ভবনের মতো সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থাপনার অভ্যন্তরীণ দেখভাল ও নিরাপত্তা এমন একজন বিতর্কিত, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদার-পুত্রের হাতে কোনোভাবেই নিরাপদ হতে পারে না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এই সিন্ডিকেটের সক্রিয়তা পুরো প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শামিল।
তবে এবিষয়ে জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী জুবায়ের বিন হায়দারকে কল করলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। উল্টো তিনি প্রতিবেদককে একাধিক ব্যক্তি দিয়ে কল করান যেনো তার বিরুদ্ধে কোনো সংবাদ প্রকাশ না করা হয়৷











