নিজস্ব প্রতিনিধি ২৮ আগস্ট ২০২৬ , ৮:০৩:২২ প্রিন্ট সংস্করণ
আকাঙ্ক্ষা আর নীতি-নৈতিকতার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রশাসনিক অলিন্দে এখন চলছে এক অবাধ্য, অন্ধ ও বেপরোয়া স্বৈরাচারী লেনদেনের লুটপাট মহোৎসব। প্রকৌশল কাঠামোর দৃশ্যমান রূপায়ণের আড়ালে সংস্থাটির অন্দরে গড়ে উঠেছে প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও প্রশাসনিক মাফিয়াতন্ত্রের এক দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেট।
মেধা, সততা ও জ্যেষ্ঠতার চিরাচরিত মানদণ্ডকে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন এমনকি নতুন নিয়োগকে কেন্দ্র করে বসানো হয়েছে শত কোটি টাকার অলিখিত নিলাম। আর এই প্রাতিষ্ঠানিক মাফিয়াচক্রের সর্বেসর্বা নেপথ্য কারিগর হিসেবে যার নাম বারবার উচ্চারিত হচ্ছে, তিনি প্রশাসন শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুর রহমান, যিনি প্রকৌশলীক অপব্যবহার, প্রশাসনিক ক্ষমতার চূড়ান্ত অপপ্রয়োগ এবং জালিয়াতির জাল বিছিয়ে স্রেফ একাই বাগিয়ে নিয়েছেন প্রায় ৩০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ!
প্রকৌশলীক নাটাই নিজ কব্জায় রেখে সংস্থাটিকে কীভাবে দুর্নীতির এক অবাধ চারণভূমিতে পরিণত করা যায়, তার সমস্ত কলাকৌশল রপ্ত করেছে এই চক্রটি। সম্প্রতি ১৯৭ জন সহকারী প্রকৌশলীকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির পাইপলাইনে তুলেই শুরু হয় নজিরবিহীন অর্থ শিকার- জনপ্রতি ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা নগদ নজরানা না দিলে ফাইল নড়ে না বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠে এসেছে।
জ্যেষ্ঠতার শৃঙ্খল চুরমার করে সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রকৌশলী থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদের পশরা সাজিয়ে প্রায় ১৩৫ জন কর্মকর্তার কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে মোটা অঙ্কের অর্থ; বাদ পড়েনি সার্ভেয়ার পর্যায়ও, যেখান থেকে পদোন্নতির টিকিট পেতে গুনতে হয়েছে ৪ থেকে ৭ লাখ টাকা। একটি সূত্র জানায়, মেধার অবমূল্যায়নে-বিধিমালাকে তোয়াক্কা না করে স্রেফ পকেটের গভীরতা মেপে কনিষ্ঠ প্রকৌশলী জ্যেষ্ঠতার চেয়ারে বসিয়ে দেওয়ার এই ‘স্পেশাল প্যাকেজের’ মূল্য হাঁকা হয় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা।
বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রেও প্রকৌশলীক ভারসাম্যকে তছনছ করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে চড়া অলিখিত রেটকার্ড। অনুসন্ধানে উদঘাটিত তথ্যানুযায়ী, লোভনীয় ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সাভারের পোস্টিং বাগাতে হাতবদল হয়েছে ১৫ লাখ টাকা; জাজিরায় সহকারী প্রকৌশলীর চেয়ারটির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১০ লাখ টাকা, আর বরিশাল সদর থেকে ঘুরিয়ে বাবুগঞ্জ উপজেলায় প্রকৌশলী বানাতে ‘কামাল’ নামের এক প্রকৌশলীর পকেট থেকে খসানো হয়েছে ৫ লাখ টাকা। সার্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট কিংবা লাভজনক উপজেলায় আসন গাড়তে কর্মকর্তাদের দিতে হয়েছে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকার পর্বতপ্রমাণ ঘুষ।
তবে এই অর্থ-সাম্রাজ্যের মূলোৎপাটন কেবল একক ব্যক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদী এক প্রাতিষ্ঠানিক আঁতাত ও প্রশাসনিক অশুভ জোটের ফসল। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমের আমলে সরাসরি বাসভবনের বন্ধ দরজায় বসে ‘আব্দুল ওহাব’ নামের এক মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল নিয়োগ বাণিজ্যের প্রায় দেড় কোটি টাকার এক গোপন চুক্তি। সেই চুক্তির সমঝোতা অনুযায়ী, ১ কোটি টাকা তৎকালিন প্রধান প্রকৌশলীর ঝুলিতে, ৩০ লাখ টাকা শফিকুর রহমানের পকেটে এবং অবশিষ্টাংশ অনুগত সাঙ্গোপাঙ্গদের মধ্যে বণ্টনের নীল নকশা চূড়ান্ত করা হয়।
কেবল তা-ই নয়, শফিকুর রহমান, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সাইফুল কবির এবং ওহাব সিন্ডিকেটের মদদে বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ১২ জন প্রকৌশলীকে বেআইনি পদোন্নতি দেওয়ায় রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত প্রায় ৫ কোটি টাকার বেতন-ভাতার বোঝা চেপেছে, পক্ষান্তরে রক্ত পানি করা শত শত যোগ্য প্রকৌশলী বঞ্চনার অন্ধকারে ধুঁকছেন।
প্রশাসনিক ক্ষমতার অপপ্রয়োগের মাধ্যমে গড়ে তোলা এই সাম্রাজ্যে শফিকুর রহমানের জীবনযাত্রাও যেন কোনো এক রূপকথার সমান্তরাল নজির। অবৈধভাবে আহরিত অর্থ বিদেশে পাচার, একটি সূত্র জানায়, ঢাকার মিরপুর-১০ এর একটি সাধারণ সেলুন ও স্পাতেই একবারে উড়িয়ে দেন ১০ হাজার টাকা। এই সিন্ডিকেটে সহযোগী হিসেবে ‘সোহেল’ নামের একজন বাগিয়ে নিয়েছেন প্রায় ৫ কোটি টাকা এবং ‘মান্নান’ নামক ব্যক্তি হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ৫০ লাখ টাকা।
এলজিইডির প্রকৌশলীক কাঠামোর এই ক্ষত নতুন নয়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধান প্রকৌশলীর দুর্নীতি তদন্তকালেই প্রথম শফিকুর রহমানের নাম ব্যাপকভাবে উঠে আসে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের এপ্রিলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) উপপরিচালক আজিজুল হকের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের দুর্ধর্ষ তদন্ত দল নিয়ে মাঠে নামে। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ওয়াহিদুর রহমান, আলী আকতার হোসেনসহ বহু প্রকৌশলীর শত কোটি টাকার দুর্নীতি অনুসন্ধানের সময় শফিকুল ইসলাম ও শফিকুর রহমানের সমন্বিত সিন্ডিকেটের থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ে।
২০১০ সাল থেকে সংঘটিত সমস্ত নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির নথি তলব, মে মাসে ১,৬০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযানে হানা এবং সম্প্রতি ৩৬টি অফিসে একযোগে নজিরবিহীন তল্লাশি চালিয়েও এই প্রভাবশালী মহলের অশ্বমেধ যজ্ঞ কোনো অজ্ঞাত ক্ষমতার জোরে থামানো যায়নি।
সংস্থার প্রশাসনিক মেরুদণ্ড দুমড়ে-মুচড়ে দেওয়া এসব গুরুতর ও অভিযোগের বিষয়ে শফিকুর রহমানের মন্তব্য জানতে কল করা হলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।











