নিজস্ব প্রতিনিধি ২৬ আগস্ট ২০২৫ , ১:০২:১৯ প্রিন্ট সংস্করণ
গণপূর্ত বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ আহসানকে ঘিরে যে অভিযোগপত্র ক্রমে স্তূপীকৃত হচ্ছে, তা নিছক ব্যক্তিগত অপবাদ নয়- বরং রাষ্ট্রীয় অর্থ লুণ্ঠনের অন্ধকার নাটক। অনুসন্ধান বলছে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি, ভ্যারিয়েশন টেন্ডার বাণিজ্যে ঘুষ, নিম্নমানের কাজ, পক্ষপাতমূলক বিল পরিশোধ থেকে শুরু করে প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের নামে পোস্টিং-বাণিজ্য- সবখানেই রয়েছে এই প্রকৌশলীর ছাপ।
প্রথমত, টেন্ডার দুর্নীতি যেন রীতিমতো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। ভ্যারিয়েশন টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নিয়ম ভঙ্গ, এলটিএমের নামে জালিয়াতি ও অযোগ্য ঠিকাদারদের পক্ষে পক্ষপাতমূলক কার্যক্রম ইতোমধ্যেই প্রকৌশল পেশার মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
দ্বিতীয়ত, ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন পর্যন্ত রক্ষা পায়নি। শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ সংস্কারে নিম্নমানের কাজের মাধ্যমে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ উঠেছে। প্রয়োজনহীন প্রকল্পে অর্থ অপচয় করাকে তিনি যেন নিয়মে পরিণত করেছেন।
তৃতীয়ত, পছন্দের ঠিকাদারদের পক্ষপাত প্রদানে রাশেদ আহসান অভিযুক্ত। ময়মনসিংহ, নোয়াখালীর বহিরাগত ঠিকাদার ও আওয়ামীপন্থী কন্ট্রাক্টররা সুবিধা পেয়েছেন তার বিশেষ প্রভাবে, অন্যদিকে অপ্রিয়দের বিল আটকে দেওয়া হয়েছে পরিকল্পিতভাবে।
চতুর্থত, সরকারি অর্থ আত্মসাতের নয়া কৌশলও হাতছাড়া হয়নি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এপিপি প্রকল্পে ৮-১০% হারে কেটে নেওয়া হয়েছে বিল থেকে, আর অধিকাংশ প্রকল্পে চুক্তিমূল্য অতিক্রম করে অতিরিক্ত বিল আদায় করা হয়েছে।
পঞ্চমত, পাইকপাড়ার সরকারি ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প যেন লুটপাটের মডেল। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে দ্বিগুণ ওভার-ইস্টিমেট করে বিল আদায় করা হয়েছে, আরসিসি ও অন্যান্য নির্মাণকাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ কাজে সাবেক এমপি নিখিল ও সাবেক প্রতিমন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কথাও উঠে এসেছে।
ষষ্ঠত, প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে পোস্টিং-বাণিজ্যের অভিযোগও কম নয়। ঘুষ দিয়ে পছন্দের পদে বসে পরে তা থেকে অবৈধ লেনদেন চালিয়ে যাওয়া- একে এক ধরনের প্রশাসনিক মাফিয়াতন্ত্র হিসেবেই আখ্যা দিচ্ছেন সহকর্মীরা।
এছাড়া বিভাগে বিভেদ সৃষ্টি, ভিন্নমত দমন, অসামাজিক কর্মকাণ্ড এবং ঠিকাদারদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের মতো গুরুতর অভিযোগও বিদ্যমান। সাংবাদিকদের বারবার যোগাযোগের চেষ্টা এড়িয়ে যাওয়া তার কর্মকাণ্ডের বৈধতা নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
সবমিলিয়ে, একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে ঘিরে এমন বহুমুখী অনিয়মের চিত্র শুধু গণপূর্ত বিভাগের সুনামকেই কলঙ্কিত করছে না, বরং রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও প্রকৌশল পেশার মর্যাদাকে নৃশংসভাবে ধ্বংস করছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এতসব অভিযোগের মুখে রাশেদ আহসান নীরব কেন? তার এই নীরবতা কি দায়স্বীকার, নাকি আড়ালের কোনো শক্তির পাহারায় দুর্নীতির সাম্রাজ্য রক্ষার চেষ্টা?










