• ঢাকা, বাংলাদেশ    
  • বুধবার , ২৫ জুন ২০২৫ ,১৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • প্রকৌশল সংবাদ

    আশ্রয়ণে অনিয়মে খোদ ইউএনওর হরিলুট

      নিজস্ব প্রতিনিধি ২৫ জুন ২০২৫ , ১:৫৭:০৫ প্রিন্ট সংস্করণ

    পীরগাছা উপজেলার শল্লারবিলে মুজিববর্ষ উপলক্ষে বাস্তবায়িত আশ্রয়ণ প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম, লুটপাট ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে—আর এই অন্ধকার প্রকল্প বাস্তবায়নের মূল সমন্বয়ক হিসেবে এবার প্রকাশ্যে এসেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুল হক সুমনের নাম। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই প্রকল্পটি চরম অব্যবস্থাপনা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং টাকার বানিজ্যে পরিণত হওয়ায় স্থানীয় জনমনে চরম ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। অথচ এসব অভিযোগের জবাব জানতে ইউএনওকে বারবার ফোন, মেসেজ এবং চিঠি দেওয়া হলেও—তিনি নিরব, নিশ্চুপ ও বেপরোয়া।

    সরকারি নির্দেশিকা উপেক্ষা করে ত্রি-ফসলি কৃষিজমিতে আশ্রয়ণ প্রকল্প নির্মাণের পেছনে কী যুক্তি ছিল—এমন প্রশ্নের জবাব না দিয়ে যেন নাজমুল হক সুমন নিজেই দাফন করেছেন প্রশাসনিক জবাবদিহিতা। ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করে বিক্রির অভিযোগও চাপা দেওয়া যায়নি—স্থানীয় ড্রেজার মালিক আমজাদ হোসেন গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন, তিনি ইউএনও প্রশাসনের অঙ্গুলিহেলনে ৩১০০ টাকা প্রতি সিফট দরে বালু কেটেছেন। এতে প্রায় চার কোটি টাকার বালু লোপাট হয়েছে, যার এক টাকাও সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি।

    প্রকল্প নথিতে মাটি ভরাটের স্তর ৫-৬ ফুট দেখালেও বাস্তবে তা করা হয়েছে দেড় থেকে তিন ফুট পর্যন্ত—ফলে বর্ষায় ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিক, স্কুল, কবরস্থান, খেলার মাঠ, সুপেয় পানির ব্যবস্থার মতো মৌলিক নাগরিক সুবিধা উপেক্ষিত রাখা হয়েছে, যা মানবিকতা ও পরিকল্পনার চরম ব্যর্থতা।

    আরও ভয়ঙ্কর তথ্য হলো—৩২০টি পুনর্বাসিত পরিবারের মধ্যে অন্তত কয়েকজন গৃহহীন মানুষ মানবিক অব্যবস্থাপনার কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন, যাদের কবরস্থান না থাকায় প্রকল্প সীমানার বাইরে দাফন করতে হয়েছে। ভূমিহীনদের কাছ থেকে ১০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায়ের অভিযোগও প্রবলভাবে উঠে এসেছে, যেখানে টোকেনের সরবরাহে ইউএনও সুমনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

    প্রকল্পে দরপত্র প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার হাতে সাব-কন্ট্রাক্ট দিয়ে কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে—যা প্রশাসনিক ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহার ছাড়া আর কিছু নয়। অথচ এই প্রকল্পটি ছিল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ কাবিখা প্রকল্পের আওতায়—যেখানে স্থানীয় শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো ছিল বাধ্যতামূলক। বাস্তবে, কোনো শ্রমিক না দিয়ে ড্রেজার দিয়ে মাটি কাটা হয়েছে, যা সরাসরি সরকারি নীতিমালার পরিপন্থী।

    সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, বহু উপকারভোগীর কবুলিয়ত এখনো সম্পাদিত হয়নি, তাদের নাম নেই ভিজিএফ কার্ডের তালিকায়—ফলে সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা আজো বঞ্চিত।

    গণতদন্ত-এর পক্ষ থেকে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা দিয়ে ইউএনও নাজমুল হক সুমনের কাছে লিখিত ও ইমেইলে ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। বরং একাধিকবার ফোন করেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এ নীরবতা শুধু দায় এড়ানোর চেষ্টা নয়—এটি একটি ভয়ানক দুর্নীতিকে আড়াল করার সরকারি কাঠামোর প্রতিচ্ছবি।

    এই প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অগ্রাধিকারভুক্ত হলেও বাস্তবায়নের নামে যে ‘তাণ্ডব’ চালানো হয়েছে তা যেন সরাসরি শেখ হাসিনার স্বপ্নের উপরই চপেটাঘাত। ইউএনও নাজমুল হক সুমনের এমন নির্লজ্জ ভূমিকা ও প্রশ্নবিদ্ধ নীরবতা প্রকল্প সংশ্লিষ্ট দুর্নীতির দায় থেকে তাকে কোনোভাবেই রক্ষা করে না। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত এই প্রকল্পে যারা বাণিজ্য করেছে—তাদের মুখোশ এখন উন্মোচনের সময় এসেছে।

    চলবে…