এম এইচ মুন্না ১৮ জুন ২০২৫ , ৩:৪৬:০৮ প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) আইয়ুব আলী—নামটি এখন দুর্নীতির প্রতিশব্দ। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের আড়ালে বহুমাত্রিক আর্থিক অপরাধের নির্মম চিত্র এ ব্যক্তি এক দশক ধরে নিজের হাতে নির্মাণ করেছেন। বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত ৩,২০০ কোটি টাকার প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আড়ালে তিনি শুধু কোটি কোটি টাকা নয়, পুরো দপ্তরটাকেই ক্যান্সারের মতো গ্রাস করেছেন—নিয়োগ, টেন্ডার, সরঞ্জাম, কমিশন, দলবাজি, বদলি—কোন কিছুই রক্ষা পায়নি তার দুর্নীতির থাবা থেকে।
নিজেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এপিএস সাইফুজ্জামান শেখরের ‘খালাতো ভাই’ পরিচয়ে পরিচিত করিয়ে বছরের পর বছর ধরে তিনি দপ্তরে চালিয়েছেন বেপরোয়া কর্তৃত্ব। তার এই আত্মঘোষিত আত্মীয়তার খোলসেই গড়ে তুলেছেন প্রভাবশালী সিন্ডিকেট—যাদের কাজ ছিল সরকারি অর্থ চুষে খাওয়া আর প্রতিপক্ষদের ঠান্ডা করে রাখা। বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্তদের ছত্রছায়ায় থেকে আইয়ুব আলী টেন্ডার বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য এবং বিল বিভাজনের নামে পুরো প্রতিষ্ঠানটিকে ঘুষখোরদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত করেছেন।
বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত প্রকল্পে ১১টি নিম্নমানের ড্রেজার কেনার নামে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ঘুষ আত্মসাৎ করেন তিনি। নিয়মবহির্ভূত বিল অনুমোদন করে সরকারি কোষাগার লুট করে ফেলেন নির্দ্বিধায়। আমদানিকৃত ড্রেজারগুলোর অধিকাংশ এখন পড়ে আছে অকেজো অবস্থায়, কিন্তু তাতেও দাপট কমেনি এই দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীর। বরং, ঠিকাদারদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে একাধিকবার অপমানিত ও মারধরের শিকার হয়েও অনায়াসে ক্ষমতার চূড়ায় থেকে গেছেন—কারণ তার পেছনে ছিল এক ‘অদৃশ্য হাতের’ ছাতা।
২০২৫ সালের ৫ আগস্ট, আওয়ামী সরকারের পতনের দিনেই বুড়িগঙ্গার তীরে ৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতিয়ে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় ৩০ কোটি টাকার ঘুষ আত্মসাৎ করেন তিনি—এই ঘটনা এখন নৌ-পরিবহন খাতের সর্বত্র আলোচিত। অভিযোগ আছে, এই অর্থের একটি বড় অংশ অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত দুই ছেলের অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। এমনকি লন্ডন ও নিউইয়র্কে ফ্ল্যাট কেনারও স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে, যদিও আইয়ুব আলী সকল অভিযোগ অস্বীকার করে স্রেফ বলেন, “আমি সৎ কর্মকর্তা।”
দুর্নীতি দমন কমিশনে তার বিরুদ্ধে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়লেও, সেই তদন্ত আজও ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। একটি মহল বলছে, সাবেক প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর ঘনিষ্ঠতা এবং শেখরের ছত্রছায়ায় থাকার কারণেই আইয়ুব আলী ছিলেন ‘ধরাছোঁয়ার বাইরে’।
বিআইডব্লিউটিএ’র অনেক সৎ কর্মকর্তা আজ ক্ষোভে ফুঁসছেন। তারা বলছেন, আইয়ুব আলী বিগত ১৫ বছরে যে অঙ্কের দুর্নীতি করেছেন, তা “সাগর চুরির” মতোই ভয়াবহ। প্রতিষ্ঠানটির অজস্র প্রকল্প তার হাতে পড়ে হয়েছে লুটের বাজার। এ ধরনের কর্মকর্তা না সরালে, না শাস্তি দিলে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতির ধ্বংসস্তূপে রূপ নেবে—এই আশঙ্কাই এখন সর্বত্র।
এটি কেবল একজন দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীর গল্প নয়—এটি একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের পচন ও নৈতিক বিপর্যয়ের উদাহরণ। আইয়ুব আলীর মতো ঘুষচক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় না আনলে, ন্যায়বিচার কেবল মুখে মুখেই থাকবে—প্রতিষ্ঠানে নয়।




