নিজস্ব প্রতিনিধি ২৭ জুলাই ২০২৬ , ২:৩১:৩৫ প্রিন্ট সংস্করণ
স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলার প্রশাসনিক উদ্যোগ যখন কাগুজে ফাইলেই বন্দি থাকে, তখন পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার অসারতাই প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। ঠিক এমন এক স্থবির ও হতাশাজনক চিত্র এখন দৃশ্যমান সরকারি নির্মাণ খাতের অন্যতম প্রধান সংস্থা গণপূর্ত অধিদপ্তরে। দীর্ঘদিন ধরে একই দপ্তরে খুঁটি গেড়ে বসা, শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা এবং নিম্নমানের কাজের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ের অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে বদলির সুনির্দিষ্ট সরকারি নির্দেশনা জারি করা হলেও তা বাস্তবায়নে নেমে এসেছে চরম ধীরগতি। দীর্ঘ আট মাস অতিবাহিত হলেও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ কার্যত অমান্য করে এবং নানা আইনি ও প্রশাসনিক ফাঁকফোকর তৈরি করে অভিযুক্ত প্রকৌশলীদের সিংহভাগকেই আগের জায়গায় বহাল রাখা হয়েছে, যা পুরো সংস্থার প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে বড় ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, অধিদপ্তরের একশ্রেণির উপ-সহকারী, সহকারী ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী দীর্ঘ এক থেকে দুই দশক ধরে ঢাকার কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করে রেখেছেন। যেমন, ঢাকা গণপূর্ত উপ-বিভাগ-১-এ কর্মরত উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মুহাম্মদ আনিসুজ্জামান ২০০৭ সালে নগর গণপূর্ত বিভাগে উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকে দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে ঢাকার বাইরে কোনো পোস্টিং পাননি। গুলশান রক্ষণাবেক্ষণ সেকশন ও সার্কেল-৪ হয়ে তিনি বর্তমানে স্বপদেই বহাল আছেন। একইভাবে ২০১২ সালে তেজগাঁও ঢাকা ডিভিশন-৩-এ সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেওয়া মো. ইউনুস গত ১৪ বছরেও ঢাকার বাইরে যাননি; বর্তমানে তিনি পদোন্নতি পেয়ে সার্কেল-১-এ কর্মরত।
আবার ২০১০ সালে যোগ দেওয়া উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রায়হান মিমিও দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ (তেজগাঁও)-এ অবস্থান করছেন। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন একই স্থানে অবস্থান করার সুযোগে এসব প্রকৌশলী কয়েকটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটে বিভক্ত হয়ে উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করছেন, যার সরাসরি বলি হচ্ছে রাষ্ট্রের উন্নয়ন প্রকল্প ও জনগণের করের টাকা।
এই প্রশাসনিক অরাজকতা ও অনিয়ম নিরসনে গত বছরের ৩ নভেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম ‘গণপূর্ত অধিদপ্তরে দীর্ঘদিন যাবৎ কর্মরত প্রকৌশলীদের ঢাকার বাইরে বদলি করে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে’ ৬৮ জন প্রকৌশলীকে বদলি ও পদায়ন নীতিমালা ২০২৫ অনুযায়ী ঢাকার বাইরে বদলির নির্দেশ দিয়ে প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠির সঙ্গে যুক্ত সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট তৈরি করে নিম্নমানের কাজ ও দুর্নীতি করার স্পষ্ট প্রমাণ তুলে ধরা হয়। কিন্তু নির্দেশনার আট মাস কেটে গেলেও ৬৮ জনের মধ্যে মাত্র ৯ জনের বিষয়ে আংশিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে প্রকৃতপক্ষে ঢাকার বাইরে পোস্টিং পেয়েছেন মাত্র ৪ জন। পদোন্নতি বা অন্যান্য অজুহাতে ৫ জন ঢাকার ভেতরেই নতুন দপ্তর পেয়েছেন, আর ২ জনের বদলির আদেশ অলৌকিকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। বাকি ৫৮ জন কর্মকর্তাই রয়ে গেছেন সম্পূর্ণ অস্পর্শিত।
এই তালিকায় থাকা সিভিলের ৭ জন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর মধ্যে শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত উপ-বিভাগ-৪-এর মো. মতিউর রহমান মজুমদার এবং ঢাকা গণপূর্ত জরিপ উপ-বিভাগ-২-এর অসীম চন্দ্র স্বর্ণকারের বদলির আদেশ রহস্যজনকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। আজিমপুর গণপূর্ত উপ-বিভাগ-২-এর মো. মিজানুর রহমান, মতিঝিল গণপূর্ত উপ-বিভাগ-২-এর মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম খান এবং গণপূর্ত রেলওয়ে ডাইভারশন উপ-বিভাগের মিহির কুমার রায়কে বদলি করা হলেও মুহাম্মদ আনিসুজ্জামান ও মোহাম্মদ রায়হান মিয়া এখনো স্বপদে বহাল। সহকারী প্রকৌশলীদের ২৫ জনের তালিকায় থাকা সাভারের আখতার বুলবুল আহম্মেদ, মিরপুরের শেখ মোহাম্মদ এনামুল হক, ঢাকা জোনের মো. ইউনুস আলী মোল্লা এবং পিপিসির মো. মনিরুল মোর্শেদ বদলি তো দূর, উল্টো পদোন্নতি পেয়ে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হয়েছেন।
আবারও ঢাকা সার্কেল-৪-এর মুহাম্মদ দোলোয়ার হোসেন ও মুহাম্মদ রুহুল আমিন, শেরেবাংলা নগরের আলী আকবর মিয়া, ঢাকা বিভাগ-২-এর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেলের খান শাহীন হোসেন, ঢাকা সার্কেল-৩-এর মোহাম্মদ ইব্রাহিম খান ও আব্দুল করিম শেখ, ঢাকা সার্কেল-২-এর মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার, ঢাকা সার্কেল-১-এর মো. আনিছুর রহমান ও মো. ইউনুস, ঢাকা বিভাগ-৪-এর মো. ইয়াকুব মিয়া, প্রকল্প সার্কেল-২-এর মো. ইউনুস ভূঞা, ঢাকা সার্কেল-৪-এর মো. আবু সুফিয়ান, জরিপ বিভাগের এ এইচ এম আহাছান-উল-হক কোরেশী, রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেলের মো. সামিউর রহমান, মেট্রোপলিটন জোনের সেলিম হোসেন, ঢাকা জোনের মো. শাহ আলম ও মোহাম্মদ রহমত উল্যা, ঢাকা সার্কেল-১-এর মো. আ. রউফ সরকার, সাভার সার্কেলের মো. রবিউল ইসলাম এবং শেরেবাংলা নগর বিভাগ-৩-এর মো. গফ্ফার হোসেন এখনো পূর্বের পদে আসীন রয়েছেন।
তালিকায় থাকা ৩৬ জন উপ-সহকারী প্রকৌশলীর ক্ষেত্রেও একই উদাসীনতা দেখা গেছে। তাদের মধ্যে মাত্র ৩ জন মোহাম্মদ মাসুদুল হাসান (নওগাঁ), মুহাম্মদ সাইদুর রহমান (ঝালকাঠি) এবং মো. আল আমিন (মানিকগঞ্জ) ঢাকার বাইরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে দেওয়ান শামছুন নাহার, তুষার আলম ও মো. মমিনুল ইসলামকে বদলি করা হলেও ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ঢাকাতেই আবার পদায়ন করা হয়েছে। এখনো ঢাকার বুকে বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন বাকি ৩০ জন উপ-সহকারী প্রকৌশলী, যাদের মধ্যে রয়েছেন আসিফ হাসান রেজা, মো. মোবারক হোসেন, মোহাম্মদ বাবুল হোসেন, মো. সাজ্জাদ কবির, মোহাম্মদ আব্দুর রহিম, মোহাম্মদ ছাইদুর রহমান, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, দিলরুবা চৌধুরী, মো. মাসুদুল হাসান, মো. মাসুদুর রহমান, মুজাহিদুল ইসলাম, আব্দুল হালিম হাওলাদার, মো. আমিনুল ইসলাম, সামসুন্নাহার, মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ, মোসা. সালমা জাহান শেলী, মো. মাহামুদুল হাসান, জিহাদুল ইসলাম, মো. জুলফিকার আরেফিন মুরাদ, শাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, মো. নুরুল কবির, মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন খান, আনন্দ চন্দ্র, মো. ইমাম হোসেন, মো. আব্দুল মোত্তালিব, মো. শিহাবুল ইসলাম এবং আব্দুল্লাহ আল মামুন।
সরকারি আদেশের এমন বেহাল দশা ও দীর্ঘসূত্রতা সম্পর্কে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বিষয়টি ‘ধাপে ধাপে’ করার অস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান। তবে এই প্রক্রিয়াকে চূড়ান্ত রকমের প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।





