• ঢাকা, বাংলাদেশ    
  • সোমবার , ২৭ অক্টোবর ২০২৫ ,১৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • প্রকৌশল সংবাদ

    উপ-সহকারী প্রকৌশলীর রাজত্ব: ফরিদুজ্জামানের দুর্নীতির সাম্রাজ্যে ঢাকার নগর

      নিজস্ব প্রতিনিধি ২৭ অক্টোবর ২০২৫ , ৯:৫১:৫৮ প্রিন্ট সংস্করণ

    ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক নিম্নপদস্থ প্রকৌশলী আজ যেন দুর্নীতির রাজদণ্ড হাতে নিয়ে নগর ভবনের আঙিনায় বেসরকারি এক শাসন কায়েম করেছেন। নাম মোঃ ফরিদুজ্জামান, পদবি, উপ-সহকারী প্রকৌশলী, কর্মস্থল ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। কিন্তু পদবির ক্ষুদ্রতা তার ক্ষমতার বিস্তারে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলেনি। অজানা এক অন্ধ শক্তির মদদে এই প্রকৌশলী সরকারি পদকে পরিণত করেছেন ব্যক্তিগত অর্থ উপার্জনের মেশিনে, আর সিটি কর্পোরেশনকে বানিয়েছেন নিজের বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের ছায়া কার্যালয়।

    সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে দুদকে একটি বিস্তৃত অভিযোগ জমা পড়েছে, যা পাঠ করলে মনে হয়, যেন সরকারি অফিস নয়, বরং এক মাফিয়া কার্যালয়ের কাহিনি। অভিযোগপত্রটি দিয়েছেন জামালপুর সদর উপজেলার সচেতন নাগরিক মোঃ খালেদুর রহমান, যেখানে ফরিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মাদকাসক্ত অবস্থায় দাপ্তরিক দায়িত্বে অবহেলা এবং সরকারি সম্পদ লুণ্ঠনের ভয়ংকর অভিযোগ।

    অভিযোগে বলা হয়, ফরিদুজ্জামান দীর্ঘদিন ধরে অফিসে অনিয়ম, অসদাচরণ ও প্রকল্প বাস্তবায়নে ইচ্ছাকৃত বিলম্ব ঘটিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। সাধারণ কর্মচারীদের সঙ্গে তার আচরণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কেউ সাহস করে মুখ খুলতে পারেন না। অধিকন্তু তিনি নিজেকে নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবলিয়ার “বড় ভাই” পরিচয় দিয়ে প্রশাসনিক ছায়া রক্ষা নিশ্চিত করেছেন।

    সরকারি বেতন স্কেলে মাসে ৪০ হাজার টাকার নিচে প্রাপ্ত এক কর্মকর্তার সম্পদ যদি বহুতল ভবন, শত বিঘা জমি ও বাজারের দোকানে প্রসারিত হয়। ফরিদুজ্জামানের নামে বা তার পরিবারের নামে ইতিমধ্যেই রাজধানীজুড়ে অগণিত সম্পদের খোঁজ মিলেছে।

    দুদকে জমাকৃত নথিতে উল্লেখ রয়েছে, আফতাবনগরে একটি ছয়তলা ভবন, শান্তিবাগের রোজ গার্ডেন ভবনে একাধিক ফ্ল্যাট, ডেমরার হাজী মিয়া রোডে গ্রীন কর্টেজ-১ ও ২-এ তিনটি ফ্ল্যাট একই এলাকায় দেড় কোটি টাকার পাঁচ কাঠা প্লট, গ্রীন কর্টেজ-৪ ভবনে আরও ফ্ল্যাট,
    মেরাদিয়া, খিলগাঁও, গুলিস্তান ও যাত্রাবাড়ী মার্কেটে ২০টি দোকান, এবং জামালপুরে শতাধিক বিঘা কৃষিজমি।

    এই বিপুল সম্পদ কোনো বৈধ আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সরকারি চাকরির ১৩ বছরে তার মোট বেতন ও ভাতা মিলে যেখানে সর্বোচ্চ বিশ লাখ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়, সেখানে তিনি আজ কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক।

    অভিযোগে আরও বলা হয়, ফরিদুজ্জামান নিজের দুর্নীতির অর্থ ‘ইউনিক কনসোর্টিয়াম’ নামের এক ভূয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে ব্যাংকে স্থানান্তর করেন। তার সমস্ত লেনদেন পরিচালিত হয় ব্র্যাক ব্যাংকের যাত্রাবাড়ী শাখা থেকে। দুর্নীতির আয় গোপন রাখতে তিনি ব্যবহার করেছেন স্ত্রী, শালী ও নিকট আত্মীয়দের নাম।

    দুদক সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগটি এখন তাদের প্রাথমিক যাচাই প্রক্রিয়ায় রয়েছে। অভিযোগের গভীরতা ও আর্থিক অনিয়মের বিবরণ দেখে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একে “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল” মামলা হিসেবে বিবেচনা করছেন।
    অভিযোগকারী খালেদুর রহমান তার আবেদনে লিখেছেন,
    “এই ব্যক্তি শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, সমগ্র প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য এক ভয়ংকর উদাহরণ। দুর্নীতির আশ্রয়ে রাষ্ট্রের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ছে। এখনই যদি ফরিদুজ্জামানের মতো কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনা না হয়, তবে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে।”

    ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অভ্যন্তরে তার প্রভাব এমন যে, প্রকল্প বরাদ্দ থেকে শুরু করে ঠিকাদারি অনুমোদন পর্যন্ত সব সিদ্ধান্তে তার একচ্ছত্র কর্তৃত্ব। তার নির্দেশ ছাড়া কোনো কাজ শুরু হয় না, কোনো বিল ছাড় হয় না। ফলে কর্পোরেশনের অনেক উন্নয়ন প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলে আছে, সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকা।