• ঢাকা, বাংলাদেশ    
  • শনিবার , ৮ আগস্ট ২০২৬ ,২রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • প্রকৌশল সংবাদ

    দুদকের চার্জশিট সত্ত্বেও অধরা ‘ফাইভ স্টার’ সিন্ডিকেটের উৎপল কুমার দে

      নিজস্ব প্রতিনিধি ৮ আগস্ট ২০২৬ , ৭:৩২:০০ প্রিন্ট সংস্করণ

    আইনের শানিত কাঠগড়া কিংবা আদালতের চার দেয়ালের প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও আইনি ব্যবস্থাকে প্রকাশ্য চপেটাঘাত ছুঁড়ে এক চরম স্বৈরাচারী দাপটে নিজের দুর্নীতি-সাম্রাজ্য পরিচালনা করছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের বরিশাল জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী উৎপল কুমার দে। সুদূর ভারতে পালিয়ে গিয়েও কারাগারের খাঁচায় বন্দিজীবন কাটানো বিতর্কিত পিকে হালদারকেও যেন দুর্নীতির মারপ্যাঁচে টেক্কা দিয়েছেন এই কর্মকর্তা; কারণ সাড়ে ছয় কোটি টাকারও বেশি অর্থপাচার ও চরম জালিয়াতির দুটি পৃথক মামলায় দুদকের চার্জশিট ঘাড়ে নিয়ে এবং আইনত বরখাস্ত হওয়ার যোগ্য হয়েও তিনি বহাল তবিয়তে, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের টাকায় উপভোগ করছেন ক্ষমতার সুমিষ্ট ফল।

    ক্যাসিনোকাণ্ডের বহুল আলোচিত ও সাজাপ্রাপ্ত ঠিকাদার জি কে শামীমের ‘ডান হাত’ এবং বিতর্কিত ‘ফাইভ স্টার গ্রুপ’-এর প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত এই প্রকৌশলী সাধারণ ঠিকাদারদের পাওনা বকেয়া বিল আটকে রেখে অফিসে লক্ষ টাকার শৌচাগার সাজাচ্ছেন, অর্ধকোটি টাকায় বানাচ্ছেন সুরম্য গেট, আর বিরাট কোহলি কিংবা মালাইকা অরোরার মতো সেলিব্রিটিদের অনুকরণে প্রতি লিটার ৭০০ রুপি মূল্যের বিলাসবহুল অ্যালকালাইন ওয়াটারে চুমুক দিয়ে প্রদর্শন করছেন ক্ষমতার চূড়ান্ত ঔদ্ধত্য।

    সরকারি চাকরি আইন ২০১৮-এর সুস্পষ্ট ৪১(২) ধারা, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা ২০১৮-এর ২৫(২) বিধি, সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের মেমোরেন্ডাম এবং বি.এস.আর (১ম খন্ড) এর ৭৩ বিধির ১ ও ২ নং নোটের সুনির্দিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী- দুর্নীতির মামলায় চার্জশিট দাখিল হওয়া বা জামিনে থাকা যেকোনো সরকারি কর্মকর্তা আইনত ‘সাময়িক বরখাস্ত’ (Suspended) বলেই গণ্য হবেন। অথচ অলৌকিক এক অদৃশ্য ভুতের ইশারায় হয়তো আইনের যাবতীয় বইপত্র নর্দমায় বিসর্জন দিয়ে, শীর্ষ কর্তাদের চোখে সুচতুর ধুলো ছিটিয়ে এই ফাইভ স্টার সিন্ডিকেটের নায়ক এখনো সদম্ভে সামলাচ্ছেন গণপূর্তের বরিশাল জোনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব।

    দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় (ঢাকা-১) কর্তৃক দায়েরকৃত মামলা (নং-২ ও ৩, তারিখ: ০৫/০৮/২০২০) এবং ২০২৩ সালে আদালতে দাখিলকৃত চার্জশিটের তথ্য বিশ্লেষণ করলে চোখ কপালে ওঠার মতো সব চাঞ্চল্যকর তথ্য উন্মোচিত হয়; যেখানে উৎপল কুমার দে এবং তার স্ত্রী গোপা দে (বর্তমান ঠিকানা: ফ্ল্যাট ৫/এ, ৮১/৩, অতীশ দীপঙ্কর সড়ক, সবুজবাগ, ঢাকা; স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম+পোঃ চক্রশালা, পটিয়া, চট্টগ্রাম)-এর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা, মানি-লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর ৪(২)(৩) ধারা এবং দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় ৬,৬২,৬৮,৭৫৪/- (ছয় কোটি বাষট্টি লক্ষ আটষট্টি হাজার সাতশত চুয়ান্ন) টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জন ও পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়াও ‘পটিয়া ইলেকট্রনিক্স’ নামক এক বেনামি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ভুয়া আড়ালে বিভাগীয় অনুমতি ছাড়াই স্ত্রীর নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লুকিয়ে রাখা ১,৬০,৬৯,২০৫/- টাকার অবৈধ উপার্জন, গচ্ছিত আরও ৫,০১,৯৯,৫৪৯/- টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গোপন এবং বেতন-ভাতা ব্যতিরেকে উৎপল দে-এর একক নামে ১,১৮,১৭,৯০৩/- টাকার অবৈধ সম্পত্তি অর্জনের সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। শুধু দেশেই নয়, অভিযুক্তের ছেলে কানাডায় অবস্থান করার সুযোগে সেখানে কোটি কোটি টাকা পাচার করে বিলাসবহুল গাড়ি কিনে দেওয়ার মতো আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিংয়ের লোমহর্ষক খতিয়ানও উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।

    ১৫তম বিসিএসে যোগদানের পর থেকেই অনিয়মের রাজত্ব গড়ে তোলা এই প্রকৌশলীর অপকর্ম নতুন নয়; কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালীন নিম্নমানের রড ও সিমেন্ট ব্যবহারের কারণে সীমানা প্রাচীর ধসে পড়ার ঘটনায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আফজাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটি তাকে সরাসরি দোষী সাব্যস্ত করলেও কোনো এক অদৃশ্য ভূতের জোরে সেই রিপোর্ট ধামাচাপা পড়ে যায়।

    পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর ৩০ অক্টোবর দুদকের নির্দেশে পুলিশের বিশেষ শাখা (SB) মারফত তার বিদেশযাত্রায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় এবং তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের নির্দেশে তাকে ওএসডি (OSD) করা হলেও, তিনি দায়িত্ব বুঝিয়ে না দিয়ে ঘাপটি মেরে থাকেন ও পরবর্তীতে চতুর লবিংয়ের জোরে বরিশাল জোনে পদায়ন বাগিয়ে নিয়ে পুনরায় শুরু করেন বদলি-বাণিজ্য, পদোন্নতি-বাণিজ্য ও ই-জিপি (e-GP) এড়িয়ে ওটিএম (OTM)-এর মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার ঘুপচি টেন্ডার রাজত্ব।

    তবে এবিষয়ে জানতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোঃ খালেকুজ্জামানকে কাছে জানতে চাওয়া হলেও তিনি বজায় রেখেছেন রহস্যজনক প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতা, আর মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ ও আইন কর্মকর্তারা এড়িয়ে গেছেন ব্যস্ততার অজুহাতে।