নিজস্ব প্রতিনিধি ২৩ আগস্ট ২০২৬ , ১:২৪:৫১ প্রিন্ট সংস্করণ
রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসনের পতন ঘটলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শেকড় গেড়ে বসা দুর্নীতির পুরোনো কারবারিদের দুর্ভেদ্য দুর্গে এতটুকুও চির ধরেনি। বরং পরিবর্তিত প্রশাসনিক অরাজকতাকে ছদ্মবেশ বানিয়ে সরকারি কোষাগার ফাঁকা করার তামসিক মচ্ছবে মেতেছেন শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১-এর বিতর্কিত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাহিদ পারভেজ রিয়াদ। নড়াইল থেকে মাগুরা, আর প্রকৌশলীক অলিন্দ পেরিয়ে শেরেবাংলা নগর-১ যেকোনো পদায়নেই তাঁর স্পর্শে সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া রূপ নিয়েছে নজিরবিহীন আর্থিক অনিয়ম, কারসাজিপূর্ণ দরপত্র, ভূয়া বিল-ভাউচার এবং বিশেষ সিন্ডিকেটনির্ভর অবৈধ লেনদেনের এক দুর্ভেদ্য গোলকধাঁধায়।
সূত্র বলছে, শিক্ষাজীবনে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সক্রিয় রাজনীতি থেকে শুরু করে রাজউকে নকশা-বাণিজ্যের ফোয়ারা ছুটিয়ে আসা এই প্রকৌশলী সম্প্রতি শেরেবাংলা নগরে এসেই শুরু করেছেন হরিলুট লঙ্কাকাণ্ড। বিশেষ করে জুনের তথাকথিত ‘জুন ক্লোজিং’ এর অন্ধকার সুযোগকে পুঁজি করে সরকারি ক্রয় বিধিমালা (PPR) ও স্বচ্ছতার মূলনীতিকে প্রকাশ্যে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মাত্র ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার স্বল্পতম বিরতিতে কোটি কোটি টাকার সরকারি বিল ছাড়ের মহোৎসব চালানো হয়েছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ১৫, ১৭ ও ২১ জুন ২০২৬ তারিখে তড়িঘড়ি করে আহ্বান করা টেন্ডার আইডি ১২৯৫৭৮৬, ১২৯৫৭৮৭, ১২৯৫৪২৬, ১২৯৩৯৫৮, ১২৯৩৯৫৯, ১২৯৩৯৬০, ১২৯৩৯৬২, ১২৯৩৯৫৭, ১২৯৩৯৫৬, ১২৯৩৯৫৪, ১২৯৩৯৫৫, ১২৯৩৯৫৩, ১২৮৮২০৩, ১২৮৮৫৯৭, ১২৮৮৫৯৮, ১২৮৮২০৮, ১২৮৮২০২, ১২৮৮২০৬, ১২৮৮২০৫, ১২৮৮২০৪, ১২৮৮২০১, ১২৮৮২০০, ১২৮৮১৯৮, ১২৮৮১৯৯, ১২৮৪৬২৬, ১২৮৪৬২৫, ১২৮৪৬২৪, ১২৮৪৬২৩, ১২৮৪৬২১, ১২৭৬০১৮, ১২৭৬০২০, ১২৭৬০১৭ ও ১২৭৬০১৬ সহ ৩৪টি ওটিএম দরপত্রের প্রকৌশলীক ভোজবাজি। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার বাহ্যিক মুখোশ পরালেও পর্দার আড়ালে নির্দিষ্ট চক্রের সাথে রেট-ফিক্সিংয়ের মাধ্যমে প্রকল্পগুলোর কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং কোনো বাস্তব কাজ ছাড়াই মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে ২৩ জুনের মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুকূলে ব্যাংকিং চেকের ফ্লাডগেট খুলে দেওয়া হয়; পাশাপাশি সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির (DPM) দোহাই দিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের মতো স্পর্শকাতর স্থানে কোটি কোটি টাকার কাজ নিজের পছন্দের খাতায় তুলে দেওয়া হয়।
এই লুণ্ঠন-কাঠামোর মূল উৎস ছিল মাগুরা গণপূর্ত বিভাগ, যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মেরামত ও সংস্কারের বরাদ্দকৃত ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা কোনো টেন্ডার ছাড়াই ‘ভাউচার বাণিজ্যে’ ভোজবাজির মতো হাওয়া করে দেওয়া হয়। জজ কোর্ট, সার্কিট হাউস ও প্রকৌশলীর বাসভবনে ১০ টাকার কাল্পনিক কাজে ৫০ টাকার বিল বানিয়ে রাজকীয় ভাগবাটোয়ারা চলে এবং মাগুরা গণপূর্তের ১০টি ই-জিপি টেন্ডারের (আইডি: ১০৭২৭১৬, ১০৭২৭১৫, ১০৭২৭১৩, ১০৭২৭১১ ইত্যাদি) ক্ষেত্রে শিডিউল বিক্রির আগেই কাজ সম্পন্ন হয়ে থাকার মতো অবিশ্বাস্য জালিয়াতি ঘটে। শুধু তা-ই নয়, গোপালগঞ্জের কালো তালিকাভুক্ত ‘মা বাবা এন্টারপ্রাইজ’-এর ১৪ কোটি টাকার কাজ সাব-কন্ট্রাক্টে সচল রাখা এবং ১০% কমিশনের বিনিময়ে বিশেষ রাজনৈতিক সিন্ডিকেটকে কাজ বাঁটোয়ারা করার একাধিক অভিযোগ উঠেছে প্রকৌশলী নাহিদ পারভেজে বিরুদ্ধে। এর আগে নড়াইলে দায়িত্ব পালনকালে নড়াইল সার্কিট হাউস ও সদর হাসপাতাল প্রকল্পে প্রায় ১০ কোটি টাকা লোপাট করার ছক কষা হয়; যার মধ্যে স্পেকট্রা-বাবর জেভিকে পাইয়ে দেওয়া আড়াই কোটি টাকার ‘মেডিকেল গ্যাস সিস্টেম’ সরবরাহ কাজে এতই নিকৃষ্ট মানের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয় যে, উদ্বোধনের পর এক মুহূর্তের জন্যও তা মানুষের নিঃশ্বাস নেওয়ার যোগ্য ছিল না, আর ডক্টরস ডরমেটরি ও অন্যান্য নির্মাণকাজে নজিরবিহীন অনিয়মের কারণে দপ্তরটি এখনো অডিট আপত্তির সাগরে ভাসছে।
এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ পারভেজের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য জানতে সরাসরি শেরেবাংলা নগরস্থ কার্যালয়ে প্রতিবেদক উপস্থিত হলেও তিনি ব্যস্ততার অজুহাতে মুখোমুখি সাক্ষাৎ এড়িয়ে যান এবং পরবর্তীতে তাঁর ব্যবহৃত সরকারি মুঠোফোনে বারবার সংযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।











