নিজস্ব প্রতিনিধি ২৬ আগস্ট ২০২৬ , ৯:১৯:০৯ প্রিন্ট সংস্করণ
গণপূর্তে ‘লুটেরা’ প্রকৌশলী জাকির-সাম্রাজ্য!এম এইচ মুন্না:
ইট-পাথর, বালু-সিমেন্ট আর রডের প্রশাসনিক বেষ্টনীতে ঢাকা পড়ে থাকা শত কোটির জাদুকরী আর্থিক সংহার; আর সেই রাজকীয় কায়কারবারের নেপথ্য কারিগর গণপূর্ত সার্কেল-১-এর বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাঃ জাকির হোসেন! সরকারি শৃঙ্খলাবিধিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, প্রশাসনিক বর্মের আড়ালে রাজকোষের তহবিলকে ব্যক্তিগত পকেটের অঘোষিত উৎসে পরিণত করার যে রূঢ় দৃষ্টান্ত তিনি গড়েছেন, তার ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে রয়েছে চাতুর্য আর রোমাঞ্চকর জালিয়াতির অখণ্ড বিস্তার।
ঝিনাইদহে নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে চরম নিম্নমানের কাজ আর বরাদ্দের টাকা তছরুপের মহোৎসবে তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় তাঁকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়ে টানা ৬ মাস ওএসডির (Officer on Special Duty) অন্ধকার কোণে বন্দি রাখে। কিন্তু আওয়ামীগপন্থি খুঁটির জোরে সেই দণ্ড পার হয়ে মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগে পোস্টিং বাগিয়ে নিতে বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হয়নি এই বিতর্কিত প্রকৌশলীকে।
মেহেরপুরে পদার্পণ করেই জালিয়াতির মাত্রা আরও কয়েক ধাপ বাড়িয়ে ২০১৭ সালের মে মাসে সরকারি অডিট দলের খাঁচায় ধরা পড়েন তিনি। পরিদর্শন বাংলোর (IB) রাজস্বের ৯ লক্ষ ৪৯ হাজার ৫৫০ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে না জমা দিয়ে সোজাসুজি নিজ পকেটে পুরে নেন। একই সাথে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ভূতুড়ে সব উন্নয়ন ও সংস্কারের ভাউচার দেখিয়ে, কোনো কাজ না করেই ৫৫ লক্ষ টাকা লোপাট করার সংহারী অডিট আপত্তি নথিভুক্ত হয়। তবে অডিট ফাইলের সেই রক্তচক্ষু ধামাচাপা দিয়ে, ওপেন টেন্ডার পদ্ধতি (OTM) ও সরকারি ক্রয় আইনকে (PPA-2006) তোয়াক্কা না করে ৪-৫টি পকেট ঠিকাদারি লাইসেন্সের সঙ্গে secret আঁতাত গড়ে প্রতিটি প্রাক্কলিত বিলে ফিক্সড ১০ থেকে ১৫ শতাংশ নগদ কমিশন আদায়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন তিনি। রাজকোষের তেলে কেনা গাড়ি ও জ্বালানি উড়িয়ে সপ্তাহে মাত্র এক-দু দিন অফিসে মুখ দেখিয়ে বাকি সময় কুষ্টিয়া ও ঢাকায় বিলাসিতার সাগরে ভেসে থাকাই ছিল তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস।
জাকির হোসেনের এই দুর্ভেদ্য সাম্রাজ্য কেবল ঝিনাইদহ বা মেহেরপুরেই আটকে থাকেনি। সম্প্রতি খুলনার নিরলা আবাসিক এলাকার নিবন্ধিত ঠিকাদার নুরে আলম সিদ্দিকি কর্তৃক গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী বরাবর দাখিলকৃত স্মারকভিত্তিক দাপ্তরিক অভিযোগপত্রে তাঁর ক্ষমতার ফ্যাসিবাদের আরেক হিংস্র চেহারা উন্মোচিত হয়েছে।
উক্ত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, খুলনা গণপূর্ত বিভাগে কর্মরত থাকাকালে তিনি তৎকালীন খুলনা জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আরাফাত হোসেন পল্টু সহ মুশফিকুর রহমান সাগর, শেখ রাফি হাসান, তৈয়েবুর রহমান, ইয়াসিন সরদার, শেখ জুয়েল ও তপুসহ সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীর সঙ্গে শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে নিবন্ধিত সাধারণ ঠিকাদারদের মারধর ও বিতাড়িত করে কোটি কোটি টাকার সরকারি কাজ বিলি-বণ্টন করতেন। ক্যাডারদের বহর নিয়ে তিনি জেলা প্রশাসক কার্যালয়, এসপি অফিস ও বিচারালয়ে গিয়ে নিজের শক্তির দাপট দেখাতেন এবং সকলকে জিম্মি করে কোনো কাজ না করেই বিল উত্তোলন করে বাংলোর বদ্ধ ঘরে বসে টাকার ভাগ-বাটোয়ারা করতেন।
এমনকি ২০১৭ সালের খুলনায় ছাত্রলীগের বিভাগীয় সম্মেলন সফল করতে সরকারি পদমর্যাদা ব্যবহার করে স্বশরীরে অর্থায়ন ও সার্বিক তদারকির নজিরও গড়েন তিনি।
দুর্নীতির এই দীর্ঘ ইতিহাস, ওএসডির কালপঞ্জি ও কেলেঙ্কারির পাহাড় পেরিয়েও অশুভ শক্তির আশীর্বাদে পদোন্নতি বাগিয়ে তিনি এখন গণপূর্ত সার্কেল-১, চট্টগ্রাম এবং গণপূর্ত ই/এম সার্কেল, চট্টগ্রামের সর্বময় কারিগরি ও প্রশাসনিক চালক! বহুতল ভবন নির্মাণ, মেডিকেলের সেন্ট্রাল এসি ও লিফট স্থাপনের কোটি কোটি টাকার টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটি (TEC) এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি। চাঞ্চল্যকর এসব নথি, অডিট আপত্তি
ও ক্যাডার তোষণের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাঃ জাকির হোসেনের মুঠোফোনে বারবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি এবং সুনির্দিষ্ট প্রশ্নাবলি সহকারে বার্তা (SMS) পাঠালেও কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।
অন্যদিকে এই মহাসংহারের বিষয়ে দাপ্তরিক অবস্থান জানতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীকেও বারবার ফোন দিয়ে পাওয়া যায়নি। অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্রের মারফতে জানা গেছে, খোদ বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধেও গণমাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতির সব খবর প্রকাশিত হওয়ায় তিনি নিজেই বিপুল অর্থে সেসব কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দিতে মরিয়া। নিজ ঘাড়েই যার পাহাড়সম অপরাধের বোঝা ও তথ্য গোপনের ব্যাকুল তাগিদ, তাঁর কাছ থেকে আরেক লুটেরা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার নৈতিক সদিচ্ছা বা আইনি পদক্ষেপের প্রত্যাশা আশা করা বেমানান।
এ যেনো শকুনের চোখে গণপূর্তের ভবিষ্যত!
এখানেই শেষ নয় চলবে…..











