এম এইচ মুন্না ৮ নভেম্বর ২০২৬ , ৮:৩৬:৪৩ প্রিন্ট সংস্করণ
একসময় দেয়ালজুড়ে ছিল রাজনৈতিক পোস্টারের দাপট, ব্যানারের বেপরোয়া প্রদর্শনী, বিজ্ঞাপনের বাহারি প্রচারণা আর অনুমোদনহীন দেয়ালিকার দখলদারত্ব। কংক্রিটের গায়ে চাপানো কাগজের স্তরে হারিয়ে গিয়েছিল অবকাঠামোর নান্দনিকতা, আড়ালে পড়েছিল নগরের সৌন্দর্য। সেই বিবর্ণ, পোস্টার-আক্রান্ত দেয়ালেই এখন রঙের তুলিতে ফিরে আসছে বগুড়ার হারিয়ে যেতে বসা ইতিহাস, হাজার বছরের ঐতিহ্য, প্রত্নতাত্ত্বিক গৌরব আর শেকড়ের লোকসংস্কৃতি। যেখানে এত দিন চোখে পড়ত বিজ্ঞাপনের দৌরাত্ম্য, সেখানে এখন চোখ আটকে যাচ্ছে মহাস্থানগড়ের প্রাচীন সভ্যতা, বেহুলার বাসরঘরের কিংবদন্তি, বৈরাগির ভিটা, জিয়ত কুণ্ডু, বগুড়ার বিখ্যাত দই, কৃষির সমৃদ্ধি আর গ্রামীণ জীবনের চিরচেনা দৃশ্যপটে।
বগুড়া মহানগরীর চার লেন জাতীয় মহাসড়কের বারোপুর ওভারপাসের উত্তর-পূর্ব পাশের দেয়ালে অ্যাক্রেলিক রঙের আঁচড়ে একের পর এক ফুটে উঠছে এসব ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম। কোথাও প্রাচীন পুণ্ড্রনগরের সভ্যতার স্মারক, কোথাও মহাস্থানগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐশ্বর্য, কোথাও বেহুলা-লখিন্দরের অমর লোককথা, আবার কোথাও লাঙলের ফলা ধরে মাঠে নেমে পড়া কৃষকের ঘামঝরা জীবনচিত্র। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বগুড়ার জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃত ঐতিহ্যবাহী দই, আলু ও লাল মরিচের মতো কৃষি-খাদ্য সংস্কৃতির পরিচিত অনুষঙ্গ। প্রতিটি চিত্র যেন আলাদা আলাদা গল্প বলছে, অথচ সব গল্পের কেন্দ্রবিন্দু একটাই- বগুড়া। যে ইতিহাস বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকার কথা ছিল, যে ঐতিহ্য কেবল স্মৃতির ভাঁজে কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার সীমানায় আটকে থাকার কথা, তা-ই এখন নগরের ব্যস্ত সড়কে চলাচলকারী মানুষের চোখের সামনে উন্মুক্ত হয়ে উঠছে।
বগুড়া সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চার লেন জাতীয় মহাসড়কের বগুড়া মহানগর অংশে রয়েছে একটি রেল ওভারপাস এবং দুটি ওভারপাস। বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ‘সাব-রিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন’ বা সাসেক-২ প্রকল্পের আওতায় ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেনের সংস্থানসহ মহাসড়কটি উন্নীত করা হয়। ২০২৪ সালে শাজাহানপুর উপজেলার বি-ব্লক ক্যান্টনমেন্ট ওভারপাস, ফুলতলা ওভারপাস, ফটকি সেতু এবং বগুড়া সদরের তিনমাথা মোড়ের রেল ওভারপাস ও বারোপুর ওভারপাস যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। আধুনিক সড়ক অবকাঠামো নির্মাণের মধ্য দিয়ে যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যুক্ত হলেও উদ্বোধনের পরপরই এসব অবকাঠামোর দেয়াল ঘিরে শুরু হয় পোস্টার, ব্যানার, বিজ্ঞাপন ও অননুমোদিত দেয়ালিকা লাগানোর প্রতিযোগিতা। ফলে কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো নির্মাণের পর যে নান্দনিক পরিবেশ প্রত্যাশিত ছিল, তা ক্রমেই ম্লান হতে থাকে কাগজের স্তর, আঠার দাগ আর প্রচারণার বিশৃঙ্খলায়।
বগুড়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদুল হক জানান, ফ্লাইওভারের দেয়ালে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পোস্টার, ব্যানার ও বিজ্ঞাপন লাগানোর কারণে নগরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছিল। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কার্যক্রম নিরুৎসাহিত করা এবং শহরের নান্দনিক পরিবেশ বজায় রাখার লক্ষ্যেই বগুড়ার স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়ে দৃষ্টিনন্দন ওয়াল আর্ট ও মুরাল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ফ্লাইওভারের দেয়ালগুলো যেন কেবল কংক্রিটের অবকাঠামো হয়ে না থাকে; বরং বগুড়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি উন্মুক্ত শিল্পগ্যালারিতে পরিণত হয়- সেই লক্ষ্যেই সওজের এই সরকারি উদ্যোগ।
প্রকৌশলী রাশেদুল হক আরও জানান, উদ্যোগটির বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং বগুড়া সদর আসনের সংসদ সদস্য মো. রেজাউল করিম বাদশা অবগত রয়েছেন। আপাতত বারোপুর ওভারপাসের দেয়ালে পাইলট প্রকল্প হিসেবে কাজটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কাজের অভিজ্ঞতা, ব্যয় এবং সামগ্রিক সাফল্য পর্যালোচনা করে পর্যায়ক্রমে বগুড়ার অন্যান্য ওভারপাস, রেল ওভারপাস ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও এ ধরনের নান্দনিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, একটি দেয়ালকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে গোটা নগরের দৃশ্যমান সৌন্দর্যবর্ধনের বৃহত্তর কর্মসূচিতে রূপ নিতে পারে।





