নিজস্ব প্রতিনিধি ২৭ জুলাই ২০২৬ , ২:২৯:২২ প্রিন্ট সংস্করণ
প্রশাসনিক ক্ষমতার মখমলি অলিন্দে যখনই রাজনৈতিক ভূকম্পন কিংবা তোষামোদের পতাকাবদল ঘটে, তখনই কিছু গিরগিটি মার্কা সুবিধাবাদীর ভণ্ডামি ও সুবিধাবাদী খোলস উন্মোচিত হয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রশাসনিক চালচিত্রের আড়ালে বসে রাজনৈতিক ভোল পাল্টানোর সেই ধ্রুপদী ছদ্মবেশে এবার চরম বিতর্কের তাণ্ডবে উঠে এসেছেন গণপূর্ত ডিজাইন সার্কেল-১, ঢাকার বিতর্কিত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ সাখাওয়াৎ হোসেন। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বিদায়ী আওয়ামী শাসনামলের ক্ষমতার অন্দরে নিজেকে ‘মুজিববাদের একনিষ্ঠ বরপুত্র’ হিসেবে জাহির করে যে একক আধিপত্যের অভেদ্য দুর্গ ও ধরাছোঁয়ার বাইরের সিন্ডিকেট সাম্রাজ্য তিনি গড়ে তুলেছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের হাওয়া বইতেই সেই একই প্রকৌশলী সাখাওয়াৎ হোসেন এখন রাতারাতি নিজেকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শের ‘কট্টর সৈনিক’ প্রমাণের মরিয়া জিকিরে মেতে উঠেছেন!
‘দৈনিক গণতদন্ত’-এর অনুসন্ধানী টিমের হাতে আসা একঝাঁক এক্সক্লুসিভ ছবি, রোমহর্ষক নথি ও দপ্তরভিত্তিক পর্যালোচনা বিশ্লেষণ করলে উন্মোচিত হয় এই চতুর আমলার ক্ষমতার সমীকরণ ও প্রশাসনিক চাতুর্যের নানা আলোড়ন সৃষ্টিকারী অধ্যায়। আদর্শিক শিকড়হীন প্রকৌশলী সাখাওয়াৎ হোসেনের আসল ধর্মই ছিল তোষামোদিনির্ভর সুবিধা আদায়, পদের প্রভাব বিস্তার এবং যেকোনো মূল্যে ক্ষমতার করিডোরে নিজের অবস্থান সুসংহত রাখা। বিদায়ী জমানার শীর্ষ নীতিনির্ধারক, মন্ত্রী, সচিব ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক কুশীলবদের সঙ্গে তাঁর অতি-ঘনঘোটা সখ্য ও জনসমক্ষে তোষামোদের রঙিন আলোকচিত্রই সাক্ষ্য দেয়, কীভাবে পেশাগত সততা জলাঞ্জলি দিয়ে তিনি ব্যক্তি ও দলীয় এজেন্ডার দাসত্ব করেছেন।
এমনকি রাজনৈতিক সমাগম ও রুদ্ধদ্বার আড্ডার নানা চিত্রে তাঁর সঙ্গে প্রকাশ্য দিবালোকে দেখা গেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটকে যেখানে যুক্ত রয়েছেন গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ কে এম কামরুজ্জামান এবং কুমিল্লা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসান হীরা সহ আরও অনেকে।
জাতীয়তাবাদী রাজনীতির এক প্রবীণ ও শীর্ষ নেতা ‘দৈনিক গণতদন্ত’-কে বলেন, “ক্ষমতার মধু যেখানে, প্রশাসনিক দেউলিয়াদের নোংরা মুখও সেখানে। প্রকৌশলী সাখাওয়াৎ হোসেন সেই বিষাক্ত পরগাছারই এক বিষধর ফসল। বিগত জমানায় প্রতিটি দলীয় শো-ডাউনে অগ্রভাগে থেকে তিনি যে তাণ্ডব চালিয়েছেন, মন্ত্রী-সচিবদের আড়ালে গণপূর্তকে যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছেন, তা নজিরবিহীন। এখন হাওয়া উল্টো বইতেই হরিণের চামড়া গায়ে জড়ানো এই বহুরূপীকে বিশ্বাস করা আত্মঘাতী। এমন সুবিধাবাদী চক্রকে প্রশ্রয় দেওয়া মানেই নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নকে বুড়ো আঙুল দেখানো।”
গণপূর্তের বঞ্চিত প্রকৌশলী ও জ্যেষ্ঠ ঠিকাদারদের হাহাকার ও অভিযোগের পাহাড় ভেদ করে জানা যায়, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়াকে ঢাল বানিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ সাখাওয়াৎ হোসেন দীর্ঘদিন ধরে দপ্তরে একচ্ছত্র সিন্ডিকেট রাজত্ব ও কমিশন বাণিজ্য চালিয়েছেন। প্রকল্প বণ্টন থেকে শুরু করে কোটি কোটি টাকার ভাগবাটোয়ারা, নকশা অনুমোদন ও বদলি-পদায়নের অদৃশ্য সুতা টানা এবং সরকারি অর্থ লুটেপুটে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর পকেটে পুরে দেওয়াই ছিল তাঁর দৈনিক রুটিন।
অধিদপ্তরের একাধিক ক্ষুব্ধ ও ভুক্তভোগী প্রকৌশলী আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “সাখাওয়াৎ হোসেনের মতো গিরগিটি প্রকৌশলীরা ক্ষমতার তোপ বদলালেই যেভাবে নিজেদের বুলি ও গায়ের পোশাক পাল্টে ফেলেন, তা প্রশাসনিক নৈতিকতার কফিনে শেষ পেরেক মারার সামিল। এক জমানায় মুজিববাদের জিকির তুলে কোটি টাকার পাহাড় গড়া লোক যখন নতুন প্রভুদের তোষামোদে ব্যস্ত হয়, তখন স্পষ্ট হয় যে তাঁদের কোনো জাত বা আদর্শ নেই, ক্ষমতা আর অর্থই তাঁদের একমাত্র উপাস্য।”
পটের এই দৃশ্যমান খোলস পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে বর্তমানে গণপূর্তের অন্দরে তুমুল অসন্তোষ, চাপা ক্ষোভ ও চরম থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। এই বহুরূপী প্রকৌশলীর বিগত আমলের যাবতীয় অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য ও সিন্ডিকেট রাজত্বের শিকড় উপড়ে ফেলতে অবিলম্বে নিরপেক্ষ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
এসব গুরুতর অভিযোগ, রাতারাতি রাজনৈতিক খোলস পরিবর্তন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ব্যাপারে বক্তব্য জানতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ সাখাওয়াৎ হোসেনের দপ্তর ও মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।





