এম এইচ মুন্না ২৮ অক্টোবর ২০২৬ , ৪:৩২:৩৬ প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রামের সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরে মেয়াদের পিঠে পদোন্নতির মোহর বসিয়ে প্রাক্তন নির্বাহী এবং অধুনা ‘প্রভাবশালী’ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (এসি) মোসলেহ উদ্দিন চৌধুরী সওজের সরকারি রাজকোষ এখন পকেটভর্তি হরিলুটের খাতিরি আখড়ায় খোদ দপ্তর-ই যেনো ফোকলা করেছে। সওজ চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জ কার্যালয়ের ধুলোঝাড়া গোপন নথি ছিঁড়ে, ‘জিরো ট্রেডিং’ নামের এক বানোয়াট, অশরীরী ও অস্তিত্বহীন ভূতুড়ে ঠিকাদার জন্ম দিয়ে- চোখের নিমেষে ২৫ লাখ ২২ হাজার টাকা স্রেফ হাওয়ায় মিলিয়ে দেওয়ার মাস্টারমাইন্ড রূপকার এই প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন ও তাঁর অনুগত বারো ভূত! পোর্ট এক্সপ্রেস সড়কের পরম স্পর্শকাতর টোল প্লাজার ওজন স্কেল-ঘেঁষা সংযোগ সড়ক মেরামতের ছলাকলা ধরে আদা-জল খেয়ে আখের গোছাতে নেমেছিল সওজের এই ধুরন্ধর সিন্ডিকেট। কাগজের পেটে পিচ ঢেলে, আর প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে রাজকোষের কড়ি চেঁচেপুঁচে গিলতে তাঁদের মোটেও বাঁধেনি কোনো আইনি কুণ্ঠা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিধি-বিধানের তোয়াক্কা জলাঞ্জলি দিয়ে ২০২৫ সালের ১৮ জুনে ‘জিরো ট্রেডিং’ নামের একটি শূন্য-অস্তিত্বের প্যাডকে সপে দেওয়া হয় সরকারি কার্যাদেশ; যার কাজের নির্ধারিত মেয়াদ বাঁধা ছিল দীর্ঘ ১০ দিনের ফ্রেমে। অথচ কোনো রোদ-বৃষ্টি কিংবা ইটের চাটনি ছাড়াই, জাদুকরী প্রশাসনিক ইন্দ্রজালে ফাইলবন্দি কাগজপত্রের গোলকধাঁধায় মাত্র তিন দিন না গড়াতেই- ২১ জুনে দেখানো হলো শতভাগ কাজের অলৌকিক রূপায়ণ! নাটকের চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা ফুটল ঠিক তার পরদিন, ২২ জুনে। সরেজমিন কোনো পরিদর্শন, মান যাচাই কিংবা হিসাবের বাছ-বিচার ছাড়াই বন্ধ সিন্দুকের তালা খুলে ২৫ লাখ ২২ হাজার টাকা চালান হয়ে গেল সেই রক্তমাংসহীন ভৌতিক সত্তার গহীন পকেটে!
কোনো মেকানিক্যাল মেশিনের বিকট গর্জন নাই, পিচ-সুরকির কালচে গন্ধ নাই, সাইটে মানুষের ঘাম নাই- অথচ কাগজ কলমে রাতারাতি জলজ্যান্ত মহাসড়ক মেরামত সম্পন্ন! রাজকোষ খালি করার এমন রোমহর্ষক কিচ্ছার সত্যতা আঁকড়ে ধরতে মাঠে নামতে বাধ্য হয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০২৬ সালের ৭ অক্টোবরে দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সাঈদ মোহাম্মদ ইমরান হোসেনের ঝটিকা নেতৃত্বে রহমতগঞ্জের সওজ দপ্তরে হাজির হোন চিরুনি অভিযানকারী টিম।
তদন্তের খাতিরে যখনই প্রাক্কলন ফাইল, অনুমোদনপত্র, মেজারমেন্ট বুক (এমবি) আর কাল্পনিক বিল-ভাউচারের নথিপত্র ধরে টান দেওয়া হলো, অমনি বোবা হয়ে গেল তদন্তকারীদের চোখ! নথিতে যার নাম ‘জিরো ট্রেডিং’, চট্টগ্রামে তো নয়ই- সমগ্র বাংলাদেশের কোথাও তার কোনো বৈধ ট্রেড লাইসেন্স, সুনির্দিষ্ট নিবন্ধিত ঠিকানা কিংবা বাস্তব অস্তিত্বের বিন্দুমাত্র কঙ্কালও নেই! রক্ত-মাংসের কোনো মালিক নাই, দৃশ্যমান কোনো আস্তানা নাই- কেবল সওজের অসাধু চক্রের বিষাক্ত সিলমোহর আর কলমের টানেই কীভাবে আস্ত কার্যাদেশ মেলে আর শতভাগ বিল উধাও হয়?
দেশের অর্থনীতির হৃদপিন্ড আর বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পরম সংবেদনশীল এই সড়ক অবকাঠামোর বুকে এমন কাল্পনিক লঙ্কাকাণ্ড- সওজের প্রশাসনিক অঙ্গনে শিকড় গাড়া এক অক্টোপাসতুল্য রামরাজত্বের হিংস্র থাবায় এহেন অবিশ্বাস্য শুভঙ্করের ফাঁকি আর কায়িক মেধার ভূতুরে কারসাজিতে প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন ও তাঁর বারো ভূতেরা এই মহা-হরিলুট করে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ার প্রতিযোগিতায় বেপরোয়া মচ্ছবে মেতে উঠেছে।
এ যেনো শকুনের চোখে সওজের ভবিষ্যৎ…… চলবে!










