• ঢাকা, বাংলাদেশ    
  • মঙ্গলবার , ৬ অক্টোবর ২০২৬ ,১৮ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • প্রকৌশল সংবাদ

    গণপূর্ত গিলে খাচ্ছে খোদ প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান

      নিজস্ব প্রতিনিধি ৬ অক্টোবর ২০২৬ , ১:০৮:২৯ প্রিন্ট সংস্করণ

    পিএইচডি জালিয়াতির দুর্নাম, শতকোটি টাকার ঘুষের দৌরাত্ম্য, জ্যেষ্ঠতার শৃঙ্খা ভেঙে পদোন্নতি বাগানো এবং সীমাহীন বদলি বাণিজ্যের ঘোরতর অভিযোগে অভিযুক্ত বিতর্কিত প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে অবশেষে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (গ্রেড-১) পদে আনুষ্ঠানিকভাবে আসীন করা হয়েছে! সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের ৪৮তম সভার সুপারিশের অছিলা দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির আদেশে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-৭ শাখার উপসচিব মো. আবু নাছের স্বাক্ষরিত ৪ অক্টোবরের প্রজ্ঞাপনে জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারিত বেতনক্রমে এই বিতর্কিত কর্মকর্তার হাতেই সোপর্দ করা হলো অধিদপ্তরের শীর্ষ চাবিকাঠি। জাল সনদের কেলেঙ্কারিতে দণ্ডিত ও অর্থমূল্যের গোলকধাঁধায় অর্জিত এই পদোন্নতির খবর চাউর হতেই ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন বুয়েট পাস বঞ্চিত জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীরা, আর ওয়াকিফহাল মহল এটিকে দেখছে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থার মুখে এক নির্মম উপহাস হিসেবে।

    সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দাখিলকৃত বিষদ অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, ২০১৪ সালে ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রির জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়ায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে লঘুদণ্ড হিসেবে এক বছরের বেতন স্কেল স্থগিতের সাজাপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তা ১০০ কোটি টাকার এক মহা-লেনদেনের গোলকধাঁধায় বিসিএস ১৫তম ব্যাচের অসামান্য মেধাবী ড. মইনুল ইসলাম, মো. আবদুল কাইয়ুম এবং প্রধান প্রকৌশলী শামছুদ্দোহাকে টপকে জ্যেষ্ঠতার ক্রম ভেঙে এই শীর্ষ পদটি বাগিয়ে নিয়েছেন।
    খালেকুজ্জামান চৌধুরীর ক্যারিয়ারের প্রতি পদক্ষেপে মিশে আছে চাতুর্য, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ আর অর্থ পাচারের গন্ধ। অতীতে ক্ষমতাধর পরিবারের বিশ্বস্ত প্রকৌশলী সেজে ফায়দা লোটা এই কর্মকর্তা পরবর্তীতে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে রূপ বদলে শেখ পরিবারের আশীর্বাদে খুলনা জোনে পোস্টিং বাগিয়ে শেখ হেলাল পরিবারের আজ্ঞাবহ হিসেবে কোটি কোটি টাকার টেন্ডার বাণিজ্য চালান। চাকরিতে যোগদানের পরপরই ভূয়া অসুস্থতা ও ভুয়া শিক্ষার কাগজ দেখিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় সপরিবারে চম্পট দিয়ে অর্জন করেন সেখানকার নাগরিকত্ব, আর একই সাথে সাফা কনস্ট্রাকশন ও তমা কনস্ট্রাকশনকে অবৈধ সুবিধা দিয়ে শতকোটি টাকার রাজস্ব চাটুকারিতার মাধ্যমে হুন্ডির মারপ্যাঁচে পাচার করেন বিদেশে।

    এই আমলার অতীত জালিয়াতির ফিরিস্তি আরও কদর্য রূপ নেয় বেইলি রোডের ‘গ্রীন কোজি কটেজ’ কেলেঙ্কারিতে; ২০১১ সালে রাজউকের অথরাইজড অফিসার থাকাকালে বাণিজ্যিক নকশা অনুমোদনে অনিয়মের যে বীজ তিনি বুনেছিলেন, ২০২৪ সালের ভয়াবহ আগুনে ৪৬ প্রাণ ঝরে পড়ার পর সেই বিষবৃক্ষ দৃশ্যমান হয়। এতকিছুর পরও পাবনা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের গ্রিন সিটির দরপত্র কেনাবেচা ও শতকোটি টাকার চাদাঁবাজির নথিপত্র ধামাচাপা দিতে দুদক কর্মকর্তা শফিকুর রহমান ও প্রদীপ কুমারকে ‘ম্যানেজ’ করে নিজের বিভাগীয় মামলা লোপাট করার দুঃসাহস দেখিয়েছেন তিনি।
    প্রধান প্রকৌশলীর রূপালী চেয়ারে বসেই খালেকুজ্জামান যে বদলি বাণিজ্যের বিষজাল বিস্তার করেছেন, তা স্মারকভিত্তিক বিচার করলেই উন্মোচিত হয়। ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর ই/এম বিভাগের ২৫.৩৬.০০০০.২১৫.১৯.১০৭.১১-১৪২৮ নম্বরের বিতর্কিত স্মারকে এক কলমের আঁচড়ে কোটি টাকার বিনিময়ে ই/এম বিভাগ-৬ এর সৈয়দ এসকান্দার আলীকে ই/এম বিভাগ-৬ ঢাকায়, নাজমুল আলম রব্বানীকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ে, মো. শরিফুল ইসলামকে ই/এম বিভাগ-১১ তে, মো. মোস্তাফিজুর রহমানকে ই/এম বিভাগ-১০ এ, মোহাম্মদ তরিকুল আলমকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে এবং রুবাইয়াত ইসলামকে ই/এম কারখানা বিভাগে বদলি করে পকেট ভারী করা হয়। জালিয়াতির একই ধারাবাহিকতায় ১৭ নভেম্বর একই দিনে একযোগে জারি করা হয় ছয়-ছয়টি রহস্যজনক স্মারক! ১৫১১ স্মারকে রাজন চক্রবর্তীকে নোয়াখালীতে; ১৫১৩ স্মারকে এ.এস.এম. সাখাওয়াৎ ইসলামকে গাজীপুর-২ এ, তানজিনা আফরিন জাহানকে তদন্ত কোষে এবং তদন্ত কোষের রিয়াদুস সালেহীন সাদী-কে শেরেবাংলা নগর উপ-বিভাগ-৬ এ পদায়ন করে পদের রেশারেশি তৈরি করা হয়। একই তারিখের ১৫১৫ স্মারকে আশরাফ-উন আলমকে মাদারীপুরে, এম.কে.এম. নূরুল হাসানকে পঞ্চগড়ে, দেলোয়ার মাহফুজ সোহাগকে দিনাজপুরে, ইজাজ আহমেদ খানকে শেরেবাংলা নগর উপ-বিভাগ-৯ এ এবং তানজিল ইসলাম ভূঁইয়াকে ইডেন ভবন উপ-বিভাগ-১ এ স্থানান্তরিত করা হয়।
    বদলি বাণিজ্যের ঝুলন্ত থলি এখানেই থামেনি; ১৭ নভেম্বরের ১৫১৪ স্মারকে ইমরান বিন কালাম ও কামরুন নাহারকে পেকু উপ-বিভাগে এবং আলী হোসেনকে প্রকিউরমেন্ট ইউনিটে ভেড়ানো হয়। ১৫১৬ নম্বর স্মারকে মো. রাজু মল্লিককে কোটি টাকার মতিঝিল উপ-বিভাগ-২ এ, মো. রফিসুর রহমানকে বরিশাল মেডিকেলে, মো. কামরুল হাসানকে ঝালকাঠিতে এবং রেজাউল ইসলাম খানকে মানিকগঞ্জ উপ-বিভাগ-২ এ পদায়ন করা হয়। অন্যদিকে ১৫১২ স্মারকে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমানকে নওগাঁ বিভাগ-২ বাগমারীতে, মো. আশরাফুল হককে লজিস্টিক অফিসার হিসেবে, মো. শাকিল অব ওয়াহিদকে নওগাঁয়, এস.এম. তৌহিদুন ইসলামকে রাজবাড়ীতে, মো. আশিকুর রহমান ও মো. শহীদুল ইসলামকে যথাক্রমে ভোলা ও পিরোজপুরে বদলি করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ অর্থ হস্তগত করা হয়। ১৪ নভেম্বরের স্মারকগুলোতেও দেখা যায় চরম স্বেচ্ছাচারিতা; ১৫৭০ স্মারকে জাহিদুল ইসলাম খানকে ডিজাইন বিভাগ-৮ এ, কামরুল হাসানকে সমন্বয় শাখায়, ফয়জুল আজম খানকে বিশেষ ডিজাইন ইউনিট-২ এ এবং এ.কে.এম তানভীর আহমেদকে সমন্বয় শাখায় বসানো হয়। এছাড়া ১৫৬১ স্মারকে এ.বি.এম. আশরাফুজ্জামানকে গুরুত্বপূর্ণ মিরপুর উপ-বিভাগ-২ এ, উৎপলকে চাঁদপুরে, আলোয়ার হোসেনকে ময়মনসিংহে এবং শেখ আরিকিন নূরকে ঢাকা উপ-বিভাগ-৩ এ বদলি করা হয়; আর ১৫২৩ স্মারকে আফাজুল হোসেনকে বরগুনায় ও ১৫২৮ স্মারকে উম্মে নায়লার সুলতানা-কে ডিজাইন প্রধানের স্টাফ অফিসার বানিয়ে পুরো গণপূর্তকে আমলাতান্ত্রিক ও আর্থিক জালিয়াতির আখড়ায় পরিণত করা হয়েছে।

    একসময়ের জাল পিএইচডিধারী সাজাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজ শতকোটির জালিয়াতি ও ক্যাডার জ্যেষ্ঠতা মাড়িয়ে প্রশাসনিক চূড়ায় সমাসীন হওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নিষ্ক্রিয়তা ও অসাধু সরকারি সিন্ডিকেটের এই হরিলুট এখন গোটা দেশের কাছে এক জলজ্যান্ত প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    তবে এবিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান।