নিজস্ব প্রতিনিধি ৪ অক্টোবর ২০২৬ , ৭:১৩:৪২ প্রিন্ট সংস্করণ
ক্ষমতার দাপট, বেপরোয়া জীবনযাপন আর প্রশাসনিক আশীর্বাদের কাছে বারবার হার মানছে আইন ও শৃঙ্খলা! মদ খেয়ে মাতাল অবস্থায় সরকারি প্রাইভেটকার চেপে একের পর এক যানবাহন গুঁড়িয়ে দিয়েও পার পেয়ে যাওয়ার এক অলৌকিক নজির গড়েছেন সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের নব্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী দেবাশীষ কুমার মন্ডল (পরিচিতি নম্বর-৭০০২০৩)। নগরীর রাজপথে রক্তাক্ত দুর্ঘটনা ঘটিয়ে, হাতেনাতে আধা বোতল মদসহ গ্রেপ্তার হয়েও কেবল সামান্য অর্থদণ্ডে সস্তা পার পেয়ে যাওয়া আর কোনো বিভাগীয় শাস্তি না হওয়া যেন প্রাতিষ্ঠানিক বিচারহীনতার মুখচ্ছবিকেই বেআব্রু করে দিয়েছে।
ঘটনাটির সূত্রপাত গেলো রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাত আনুমানিক ১০টার দিকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, দেবাশীষ মন্ডল মদ্যপ অবস্থায় চালকের আসনে বসে ঢাকা মেট্রো-গ-১৪-৭৩০০ নম্বরের প্রাইভেটকারটি নিয়ে তান্ডব চালান। তার সাথে গাড়িতে ছিলেন সওজের যান্ত্রিক বিভাগের অফিস সহকারী মামুন ও এক রহস্যময় নারী। প্রথমে নগরীর সাতরাস্তা মোড়ে এক যাত্রীসহ স্কুটিকে নির্মমভাবে ধাক্কা দিয়ে সজোড়ে ধাবিত হয়ে ময়লাপোতা মোড়ে এসে দুটি যাত্রীবাহী অটোরিকশা ও অপর একটি স্কুটিকে পিষে দেন তিনি। এতে অটোরিকশা চালকসহ দুই যাত্রী রক্তাক্ত অবস্থায় গুরুতর আহত হন। উত্তেজিত জনতা গাড়ি ঘিরে ফেললে সাদা শার্ট পরিহিত দেবাশীষ ও তার সঙ্গীরা উল্টো মারমুখী হয়ে হাতাহাতি ও বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হন।
খবর পেয়ে খুলনা সদর থানার পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার করে আধা বোতল দেশীয় ব্রান্ডের মদ। ওসি লোকমান হোসেন জানান, ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়। পরে অফিস সহকারী মামুনের মদ পানের লাইসেন্স থাকায় তাকে ছাড় দেওয়া হলেও মদ্যপ দেবাশীষকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। তবে বিস্ময়করভাবে আদালত থেকে অর্থদণ্ড পরিশোধ করেই দ্রুত মুক্তি পান দেবাশীষ কুমার মন্ডল! কিন্তু আইনের চোখে অপরাধ প্রমাণিত হয়ে শাস্তি পাওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা না নিয়ে আড়াল করে রাখায় দপ্তরের ভেতর তৈরি হয়েছে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সওজের মাগুরা ১ম সারি কারখানা উপ-বিভাগে সহকারী প্রকৌশলী থাকাকালে নিয়মিত কর্মস্থলে না গিয়ে মাসে মাত্র একদিন অফিসে হাজিরা দিয়ে পুরো মাসের সরকারি বেতন পকেটে পুরতেন তিনি। এহেন চরম ফাঁকিবাজির সুবাদেও তিনি পান প্রাক-পদোন্নতির বড় পুরস্কার! মাগুরা থেকে রহস্যজনকভাবে খুলনায় অবস্থান করা নিয়েও তৈরি হয়েছে জট। খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) গুঞ্জন বড়ুয়ার ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে তাকে মাগুরায় না রেখে বেআইনিভাবে খুলনায় বসিয়ে রাখা হয়। এমনকি তার আসল কর্মস্থল মাগুরা, প্রেষণে যশোর নাকি খুলনার ফেরি বিভাগ তা নিয়ে খোদ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্যে তৈরি হয়েছে জগাখিচুড়ি।
দপ্তরের অন্দরের খবর, আসাদুজ্জামান ওরফে ‘পার্সেন্টিজ বাবু’ নামে এক প্রভাবশালী ঠিকাদারের নেতৃত্বে খুলনায় গড়ে উঠেছে বিশেষ সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, এই ‘পার্সেন্টিজ বাবু’ ২০ লাখ টাকার মিশন বানিয়ে গুঞ্জন বড়ুয়াকে বগুড়া থেকে খুলনায় বদলি করে আনেন। এরপর গুঞ্জন বড়ুয়া, দেবাশীষ কুমার মন্ডল ও পার্সেন্টিজ বাবু এই ট্রাইও মিলে সওজের যান্ত্রিক বিভাগের সকল প্রকল্পের প্রাক্কলন (ইস্টিমেট), কাজ বণ্টন ও কমিশনের টাকা ভাগবাটোয়ারার অঘোষিত ‘রামরাজত্ব’ গড়ে তোলেন। নিয়মিত মদ পান করা এবং কর্মচারীদের সেই কাজে ব্যবহারের অভিযোগে অভিযুক্ত দেবাশীষই ছিলেন পুরো কমিশন বাণিজ্যের মূল কারিগর।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ঠিকাদার আসাদুজ্জামান বাবুর ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সওজে নিজে ঠিকাদারি না করার দাবি জানান, তবে গুঞ্জন বড়ুয়া ও দেবাশীষের নাম শুনতেই তাড়াহুড়ো করে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
অন্যদিকে, পুরো ঘটনাটি শুনেছেন দাবি করলেও নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) গুঞ্জন বড়ুয়া নিজে ছুটিতে থাকার অজুহাতে এড়িয়ে যান এবং অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. মাহবুবুল আলম খানও ঘটনা শুনেছেন বলে দায় সারেন। একাধিকবার চেষ্টা করেও অভিযুক্ত কর্মকর্তা দেবাশীষ কুমার মন্ডলের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়, আর অফিসে সরজমিনে গিয়েও তার সাক্ষাৎ মেলেনি।











