• ঢাকা, বাংলাদেশ    
  • শনিবার , ২১ জুন ২০২৫ ,১৮ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • প্রকৌশল সংবাদ

    পায়রা বন্দরে তিন প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার লুটপাট: পর্ব-০১

      প্রতিনিধি ২১ জুন ২০২৫ , ১০:১২:৪৭ প্রিন্ট সংস্করণ

    পায়রা বন্দরের উন্নয়নের নামে বাস্তবে চলছে লুটপাটের উৎসব, আর দুর্নীতির ধোঁয়াশায় ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে পড়ছে দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দরটি। তিনটি বড় প্রকল্পে অন্তত এক হাজার কোটি টাকার অর্থ লোপাট হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি তো হয়নি, উল্টো সিন্ডিকেটের ছত্রচ্ছায়ায় নিম্নমানের কাজ, দপ্তরীয় দালালচক্রের দৌরাত্ম্য আর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে পায়রা বন্দরে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ অচলাবস্থা।

    বন্দরের অভ্যন্তরীণ একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, প্রকল্পে হাজার কোটি টাকা খরচ করেও কাঙ্ক্ষিত গভীরতা, সংযোগ অবকাঠামো বা কার্যক্রমের সক্ষমতা অর্জিত হয়নি। পুরো প্রকল্পের চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে লুটপাট। সংশ্লিষ্ট তিনটি প্রধান প্রকল্প হলো—

    • ক্যাপিটাল অ্যান্ড মেনটেইনেন্স ড্রেজিং স্কিম,
    • পায়রা পোর্ট ফার্স্ট টার্মিনাল অ্যান্ড কানেকটিভিটি প্রজেক্ট,
    • ডেভেলপমেন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড সাপোর্ট ফ্যাসিলিটিজ।

    ড্রেজিং প্রকল্পে ৬,৫০০ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে মাত্র ৭০ কিলোমিটার ড্রেজিং হয়েছে—যা নির্ধারিত ৭৫ কিলোমিটার থেকেও কম, এবং নাব্যতা ৯.৩ মিটার তো দূরের কথা, বর্তমানে ৬ মিটার গভীরতাও নেই। অথচ পুরো অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে! সরাসরি ২,৫০০ কোটি টাকার কাজ না করেই টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

    ‘পায়রা পোর্ট ফার্স্ট টার্মিনাল’-এ লুটপাটের রূপ আরও নগ্ন। স্টিল পাইলিং বাদ দিয়ে কংক্রিট পাইল ব্যবহার করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মো. নাসির উদ্দিনের প্রত্যক্ষ মদদে লোকাল বালু দিয়ে মানহীন নির্মাণ কাজ চালানো হয়েছে, যার জঘন্য পরিণতি— টার্মিনালের বাউন্ডারি দেয়াল নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই ধসে পড়া। নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে দুদকের অনুসন্ধান চলছে।

    একইসাথে, প্রকল্পগুলোর ব্যয় এবং মেয়াদ একাধিকবার বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু বাস্তবে কাজের গতি রয়ে গেছে ঢিমেতালে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানের নামে চলছে অদৃশ্য সিন্ডিকেটের ছড়াছড়ি— বিশেষ করে ইনফ্রাডেব টেকনোলজি লিমিটেড ও কর্ণফুলী শিপইয়ার্ড নামক প্রতিষ্ঠান দুটির কার্যক্রম ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন।

    অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রধান প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন এবং প্রশাসন সদস্য পরিমল চন্দ্র বসু— দুজনেই নিরব, যেন সব কিছুই পূর্বপরিকল্পিত মুনাফালোভী নীরব চুক্তির অন্তর্ভুক্ত।

    প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালে কলাপাড়ায় পায়রা বন্দরের উদ্বোধন হলেও ২০১৯ সালে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করে। কয়লা ও নির্মাণসামগ্রীসহ নানা পণ্য আমদানি-রপ্তানির জন্য ব্যবহৃত হলেও এই বন্দরটি আজ ব্যর্থতা, অব্যবস্থাপনা আর লুটপাটের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

    বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, যদি দ্রুত এই দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি না করা হয়, তবে পায়রা বন্দর ভবিষ্যতে একটি অচল এবং অপমানজনক রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার উদাহরণ হয়ে ইতিহাসে ঠাঁই পাবে।

    এই দুর্নীতির দায় কার? দায় শুধু নাসির উদ্দিন কিংবা এক-দুইজন প্রকল্প কর্মকর্তার নয়—এই দায় গোটা বন্দর পরিচালনা কাঠামো, নজরদারির অভাব এবং দুর্নীতিবান্ধব আমলাতন্ত্রের। পায়রার স্রোতে এখন শুধু বালি নয়, ভবিষ্যত উন্নয়নের স্বপ্নও তলিয়ে যাচ্ছে।

     

    চলবে….