প্রতিনিধি ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৮:৫০:৫৭ প্রিন্ট সংস্করণ
সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের ২৩ থেকে ৪৬ কিলোমিটার অংশের সংস্কার কাজকে কেন্দ্র করে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের অন্দরে এখন চলছে এক অবিশ্বাস্য প্রশাসনিক ও আর্থিক কেলেঙ্কারির মহা উৎসব। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে সড়ক শক্তিশালীকরণ ও মেরামতের মহৎ উদ্দেশ্যে ‘মেসার্স সালেহ অ্যান্ড ব্রাদার্স’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হলেও, মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন ও লোমহর্ষক। সেখানে চিবিয়ে খাওয়া পিচের গন্ধ তো দূর কি, মাটির কাজের সামান্য ছোঁয়াও নেই; নেই কাঙ্ক্ষিত বেস টাইপ-১, প্রাইম কোট কিংবা ওয়্যারিং কোর্সের মতো মৌলিক ও অপরিহার্য সংস্কার কাজের ছিটেফোঁটাও। অথচ জাদুকরি কলমের সুচতুর আঁচড়ে এবং পকেট ভারী করার মায়াবী কারসাজিতে কাগজপত্রে ভোজবাজির মতো সব কাজ শতভাগ সম্পন্ন দেখিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে সরকারি কোষাগারের প্রায় ৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকার বিশাল অঙ্কের অর্থ।
গোবিন্দগঞ্জ-ছাতক সড়কের তকিপুর থেকে শুরু করে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের জাউয়াবাজার, লক্ষ্মণসোম, খারাই ও জানধরটুপি-প্রকল্পের আওতাভুক্ত এই প্রতিটি নির্দিষ্ট চেইনেজে প্রায় ২ হাজার ৫৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের সংস্কার কাজের যে ফিরিস্তি কাগজে-কলমে টানানো হয়েছে, বাস্তবে তার পুরোটাই ফাঁকা ও মরুভূমির মতো ধুসর। শুধু তাই নয়, কেলেঙ্কারির পালে হাওয়া লেগেছে প্রকল্পের ৪৩ কিলোমিটার অংশে থাকা প্রায় ২৮ মিটার দীর্ঘ একটি সেতুকে ঘিরেও। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের মোট কাজের হিসাব কষার সময় এই সেতুর অংশটি অত্যন্ত সুচতুরভাবে যথাযথভাবে সমন্বয় করা হয়নি, যার ফলে বাস্তবে সম্পন্ন না হওয়া কিংবা প্রকল্পের সম্পূর্ণ আওতাবহির্ভূত কাজের বিপরীতেও অর্থ পরিশোধের এক অভিনব ও নিরাপদ পথ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।
সংস্কারকাজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুললে বেরিয়ে আসে আরও ভয়ানক সব তথ্য। প্রকল্পের কঠোর শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট মানের উন্নত বিটুমিনাস মিশ্রণ তৈরিতে আধুনিক ব্যাচিং প্ল্যান্ট ব্যবহারের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও, মাঠপর্যায়ে সেটির বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে বসানো হয়েছে নিম্নমানের ড্রাম মিক্স ও হট মিক্স প্ল্যান্ট। আর এই অনিয়মের থলের বিড়াল যাতে কোনোভাবেই বাইরে বেরিয়ে আসতে না পারে, সেজন্য ল্যাব টিম যখন সততার সাথে সাইটে মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষা করতে পা রাখতে গেছে, তখনই তাদের নানা কায়দায় বাধা দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সড়কের দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং লাখো মানুষের জননিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত এই পরীক্ষাগুলোর গলা টিপে ধরে এভাবেই চলছে সরকারি অর্থের নগ্ন তছরুপ।
এই পুরো হরিলুট ও জালিয়াতির ফাইলচাপা দিতে পর্দার আড়ালে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, যার থাবায় টুঁটি চেপে ধরা হয় ন্যায়পরায়ণতার। প্রকল্পের যাবতীয় অনিয়ম ও অসম্পূর্ণ কাজের ভুয়া বিল নিয়ে তীব্র আপত্তি তোলায় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমানকে একরকম জোরপূর্বক রাতারাতি সিলেট থেকে সোজা বদলি করে পাঠানো হয় দিনাজপুর সওজ সার্কেল অফিসে। নথিপত্রের হিসাব বলছে, ২০২৬ সালের ১৯ মে এই বদলির আদেশ জারির পর থেকেই প্রশাসনিক মহলে শুরু হয় নানা কানাঘুষা। অনিয়মের প্রতিবাদ করা এক কর্মকর্তাকে হটিয়ে একই সময়ে বিল-সংক্রান্ত অবৈধ কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার এই যোগসূত্র যেন খোদ দুর্নীতিরই এক নিখুঁত চিত্রনাট্য।
E
এদিকে কেলেঙ্কারির চোরাবালিতে আটকে থাকা সওজের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভূমিকা যেন আরও রহস্যজনক ও হাস্যকর। ছাতক সড়ক উপবিভাগের প্রকৌশলী মো. শাহদাৎ হোসেন সাংবাদিকদের সামনে কোনো রাখঢাক না রেখেই একেবারে নির্দ্বিধায় স্বীকার করে বসেছেন, ‘সংস্কার কাজ কোথায় হচ্ছে, তা আমি জানি না!’ একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর এমন অকপট অজ্ঞতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের তদারকি এবং প্রশাসনিক কাঠামোর ভঙ্গুর অবস্থাকেই নগ্নভাবে ফুটিয়ে তোলে। অন্যদিকে, সওজের সিলেট জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) আবু সাইদ মো. নাজমুল হুদা কিংবা সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ আহাদ উল্ল্যাহর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মোবাইলের প্রান্ত চিরকালই বধির ও নীরব থেকেছে; তারা যেন দুর্নীতির এই পাহাড়ের সামনে স্বেচ্ছায় অন্ধত্ব বরণ করে নিয়েছেন।
প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ ও মালবাহী যানবাহন চলাচল করে এই গুরুত্বপূর্ণ সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কে। অথচ নীতিনির্ধারক ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের যোগসাজশে চলা এমন দুর্নীতি শুধু সরকারি পৌনে ছয় কোটি টাকাই পকেটস্থ করছে না, বরং চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে কোটি মানুষের জননিরাপত্তা ও সড়কটির দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বকে।











