• ঢাকা, বাংলাদেশ    
  • রবিবার , ২৯ জুন ২০২৫ ,২রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • প্রকৌশল সংবাদ

    জামিলের দুঃশাসন: কোটি কোটি টাকার লুটপাটেও প্রশাসনিক নিশ্চুপতা!

      নিজস্ব প্রতিনিধি ২৯ জুন ২০২৫ , ১২:৪৪:৩৪ প্রিন্ট সংস্করণ

    সরকারি প্রকল্পের নামে রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের ভয়ঙ্কর চিত্র এখন নির্বাহী প্রকৌশলী আখলাক উল জামিলের কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট। দুর্নীতি, টেন্ডার সিন্ডিকেট, কমিশন বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহার করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) এই কর্মকর্তা ময়মনসিংহ অঞ্চলকে পরিণত করেছেন এক ব্যক্তির সাম্রাজ্যে। কোটি কোটি টাকার প্রকল্পে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও রহস্যজনকভাবে নিরব রয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও প্রশাসন।

    ২০২৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের ১০০৮০৯৩ নম্বর টেন্ডার প্রক্রিয়াতেই বেরিয়ে আসে জামিলের দুর্নীতির এক নির্মম উদাহরণ। ব্রহ্মপুত্র নদীর বাঁধ নির্মাণে অংশ নেয় দুটি প্রতিষ্ঠান—মেসার্স গুডম্যান এন্টারপ্রাইজ ও মো. নাসির উদ্দিন মোল্লার প্রতিষ্ঠান। অথচ গুডম্যান ৭ কোটি ৭৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং নাসির উদ্দিন ৭ কোটি ৫৭ লাখ ৮৩ হাজার টাকা দরদিলেও প্রায় ২০ লাখ টাকা বেশি দর নিয়েও গুডম্যানকেই কাজ দেয় জামিল। প্রকল্পটি পরবর্তীতে গুডম্যান আরেক ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করে দেয়। এই তথাকথিত কাজের নামে আদতে চলেছে কমিশন লেনদেন আর চরম দুর্নীতির মহোৎসব।

    কেবল টেন্ডার নয়, প্রকল্পের অনুমোদন না হতেই জামিলের পকেটে ঢুকেছে লাখ লাখ টাকা। ময়মনসিংহের মরিচারচর থেকে ঈশ্বরগঞ্জ পর্যন্ত পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদীর বাম তীর রক্ষা প্রকল্প এখনও প্রক্রিয়াধীন থাকলেও বিভিন্ন ধাপে বিপুল অগ্রিম অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। পাউবো’র নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, কাজ শুরু হওয়ার আগেই ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ আদায় করেছেন জামিল। এমনকি ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়ার আগেই চুক্তির টাকা তোলার নজিরও রয়েছে তার নামে।

    এই দুর্নীতির আস্ফালন সম্ভব হয়েছে জামিলের রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায়। দিনাজপুরের সাবেক এমপি ইকবালুর রহমানের ভাগ্নে পরিচয়ে জামিল দীর্ঘদিন ধরে ময়মনসিংহের প্রকল্পগুলোতে নিজের কর্তৃত্ব কায়েম রেখেছেন। বারবার বদলি হলেও কৌশলে পুনর্বহাল হয়ে ফিরেছেন একই পদে। পাউবো’র অভ্যন্তরীন কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, জামিল ‘ম্যানেজমেন্টের’ চূড়ান্ত নমুনা। টাকার বিনিময়ে সব স্তরে প্রভাব বিস্তার করাই তার মূল অস্ত্র।

    প্রকৃতপক্ষে এই ‘ম্যানেজমেন্ট’ কীভাবে কাজ করে তার বর্ণনা দেন ভুক্তভোগী ঠিকাদার মো. নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, “আমরা সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও কাজ পাইনি, কারণ কমিশন না দেওয়ায় জামিল আমাদের বাদ দিয়েছেন।” এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটাই এখন পাউবো’র বাস্তব চিত্র।

    জামিলের ব্যক্তিগত সম্পদের চিত্রটিও কম ভয়ের নয়। রাজধানী ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, দিনাজপুরে জমি, বাগানবাড়ি—সবকিছুই তার আয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এতকিছুর পরেও তার বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে: এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে রক্ষা করছে কে?

    ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুর্নীতি রোধ না করলে উন্নয়ন কার্যক্রম ভেস্তে যাবে। জামিলের মতো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”

    এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (ইস্ট রিজিওন) এর অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. এনায়েত উল্লাহ জানান, “কোনো কর্মকর্তা আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

    তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—প্রমাণ, তদন্ত, কিংবা শাস্তি—সবই কি শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে? না কি দুর্নীতির এই জঞ্জাল থেকে বেরিয়ে প্রশাসন সত্যিকার অর্থে জবাবদিহিতার পথে হাঁটবে? জামিলদের মতো দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের এই লুণ্ঠন চলতেই থাকবে—প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।

    চলবে….