প্রতিনিধি ১ নভেম্বর ২০২৬ , ১০:৪৬:৫৩ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক, কেরানীগঞ্জ (ঢাকা):
ঢাকার কেরানীগঞ্জে সুবিধাবঞ্চিত ও শিখন ঘাটতিতে থাকা শিশুদের মৌলিক শিক্ষাদক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে ‘পাঠমিতা’ কার্যক্রম। বাংলা পড়া, লেখা ও গণিতে শিশুদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে আনন্দময় ও শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে এ বিশেষ উদ্যোগ। ৬০ দিনের এ শিক্ষা কার্যক্রমে পাঁচটি গ্রামের মোট ২০০ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছে।
ইনস্টিটিউট অব ইনফর্মড ডেভেলপমেন্ট (IID)-এর সহযোগিতায় স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশন ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (ASDS) কেরানীগঞ্জে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। ‘টিচিং অ্যাট দ্য রাইট লেভেল’ (Teaching at the Right Level-TaRL) পদ্ধতির আলোকে পরিচালিত এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ৮ থেকে ১৩ বছর বয়সী যেসব শিশু বয়স ও শ্রেণি অনুযায়ী প্রত্যাশিত শিখনদক্ষতা অর্জন করতে পারেনি, তাদের শেখার ঘাটতি পূরণ করা।
কেরানীগঞ্জের কাঠালিয়া, আটি ভাওয়াল, বাংলানগর, চন্ডিপুর ও হিজলা—এই পাঁচটি গ্রামে পরিচালিত হচ্ছে পাঠমিতা কার্যক্রম। স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে সম্পৃক্ত করে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিশুদের পাঠদানের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফ্যাসিলিটেটররা নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সপ্তাহে পাচ দিন, প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে শিশুদের পাঠদান করছেন।
পাঠমিতা কার্যক্রমে প্রচলিত শ্রেণিভিত্তিক পাঠদানের পরিবর্তে শিশুদের প্রকৃত শিখনদক্ষতা বিবেচনায় নিয়ে দলভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। গল্প, ছড়া, ছবি, বিভিন্ন শিক্ষাসহায়ক উপকরণ, দলীয় কাজ ও খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুদের বাংলা পড়া, লেখা এবং গণিত শেখানো হচ্ছে। ফলে শিশুরা আনন্দের সঙ্গে নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী শেখার সুযোগ পাচ্ছে।
শিশুদের শেখার অগ্রগতি নিশ্চিত করতে কার্যক্রমের শুরুতে তাদের প্রাথমিক শিখনদক্ষতা যাচাই করা হয়। পরবর্তী সময়ে নির্দিষ্ট বিরতিতে বাংলা ও গণিতে তাদের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হয়েছে। মূল্যায়নের ভিত্তিতে শিশুদের শিখনস্তর নির্ধারণ করে পরবর্তী পাঠদান পরিচালনা করা হয়। যারা নির্ধারিত দক্ষতা অর্জন করে, তারা পরবর্তী স্তরে উন্নীত হওয়ার সুযোগ পায়। আর যাদের আরও অনুশীলন প্রয়োজন, তাদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়।
সম্প্রতি ৬০ দিনের শিক্ষা কার্যক্রমের শেষ ক্লাস পরিদর্শন করেন অ্যাকশন ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির (ASDS) প্রেসিডেন্ট তরিকুল ইসলাম রাতুল। এ সময় তিনি শিশুদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং ৬০ দিনের শিক্ষা কার্যক্রমে তারা কী কী শিখেছে, বাংলা পড়া, লেখা ও গণিতে কতটুকু দক্ষতা অর্জন করেছে, তা জানার চেষ্টা করেন। শিশুদের শেখার অভিজ্ঞতা ও নিজেদের অর্জনের কথা শোনেন তিনি।
পরিদর্শনকালে শিশুদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, শেখার আগ্রহ এবং নিজেদের অর্জন তুলে ধরার প্রচেষ্টা ছিল উৎসাহব্যঞ্জক। তিনি শিশুদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ধরে রাখা এবং নিয়মিত শেখার চর্চা অব্যাহত রাখার বিষয়ে উৎসাহিত করেন।
এদিকে ৬০ দিনের শিক্ষা কার্যক্রম শেষে বর্তমানে অংশগ্রহণকারী ২০০ শিশুর চূড়ান্ত মূল্যায়ন (Endline Assessment) কার্যক্রম চলছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, আগামী দুই দিনের মধ্যে এ মূল্যায়নের ফলাফল পাওয়া যাবে। এর মাধ্যমে কার্যক্রমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শিশুদের বাংলা ও গণিতের দক্ষতায় কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে, তা পরিমাপ করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে শিখন ঘাটতি দূর করা না গেলে পরবর্তী শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই প্রতিটি শিশুর প্রকৃত দক্ষতা চিহ্নিত করে তার উপযোগী পদ্ধতিতে পাঠদান করা জরুরি। আনন্দময়, অংশগ্রহণমূলক ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে পাঠমিতা সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে।
উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা, কেরানীগঞ্জে পাঠমিতা কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর পরিসরে সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করবে। এর মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত ও শিখন ঘাটতিতে থাকা আরও অনেক শিশুর মৌলিক শিক্ষাদক্ষতা উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।