• ঢাকা, বাংলাদেশ    
  • রবিবার , ২৩ আগস্ট ২০২৬ ,১৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • প্রকৌশল সংবাদ

    মাঝপথে থমকে সড়ক, দুর্ভোগের চক্রব্যূহে তিন জেলার মানুষ

      নিজস্ব প্রতিনিধি ২৩ আগস্ট ২০২৬ , ১:৫০:১৮ প্রিন্ট সংস্করণ

    প্রকল্প আছে, বরাদ্দ আছে, ঠিকাদার ছিল, নেই শুধু সড়কের স্বাভাবিক গতি। ২৯৪ কোটি টাকার বিশাল প্রকল্পের মাঝপথেই থেমে গেছে দেলদুয়ার-লাউহাটী-সাটুরিয়া সড়ক নির্মাণকাজ। কোথাও পিচ উঠে কঙ্কালসার সড়ক, কোথাও বৃষ্টির পানিতে গভীর গর্ত, কোথাও কাদায় আটকে যানবাহনের চাকা, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির বদলে এখন এই সড়ক যেন দুর্ভোগের এক দীর্ঘস্থায়ী দলিল।

    ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম কার্যত মুখ থুবড়ে পড়লে নির্মাণকাজের গতি স্তব্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করা ও নানা অনিয়মের অভিযোগে আইসিসিএল ও র‍্যাব আরসি নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। কিন্তু চুক্তি বাতিলেই শেষ হয়নি জট; বরং শুরু হয়েছে নতুন জটিলতা। চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে রিট পিটিশন করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ফলে একদিকে আইনি জট, অন্যদিকে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের অনিশ্চয়তা এই দুইয়ের মাঝখানে পড়ে সড়ক আর জনদুর্ভোগ দুটোই দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

    সরেজমিনে দেখা গেছে, দেলদুয়ার থেকে ফাজিলহাটি হয়ে লাউহাটী পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন অংশে বৃষ্টির পানিতে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও ইট-খোয়া উঠে গেছে, কোথাও পিচের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াই দায়। বৃষ্টিতে সড়ক কর্দমাক্ত হয়ে পড়ায় যানবাহন চলাচল হয়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ। বড় যাত্রীবাহী বাস চলাচল আপাতত বন্ধ থাকলেও সিএনজিচালিত অটোরিকশা, পণ্যবাহী ট্রাকসহ ভারী যানবাহন বাধ্য হয়েই চলাচল করছে। খানাখন্দে পড়ে কখনো গাড়ির এক্সেল ভাঙছে, কখনো বিকল হয়ে রাস্তার ওপরই পড়ে থাকছে যানবাহন। আর প্রতিটি ঝাঁকুনির সঙ্গে যাত্রীদের শরীর যেমন কাঁপছে, তেমনি কাঁপছে সড়ক নির্মাণের বাস্তবতাও ।

    জানা যায়, এই সড়কপথ টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ এবং সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের মাধ্যম। ফলে নির্মাণকাজ মাঝপথে থেমে যাওয়ায় এর অভিঘাত পড়ছে কৃষিপণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে রোগী বহন, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতসহ সব ক্ষেত্রেই। উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দের পরও যদি একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সড়ক বছরের পর বছর নির্মাণযজ্ঞের ধুলো-কাদা আর গর্তের ফাঁদে পড়ে থাকে, তাহলে পরিকল্পনার ঘাটতি কোথায়, বাস্তবায়নের ব্যর্থতা কার এবং জবাবদিহির দায় নেবে কে?

    সওজের তথ্যমতে, ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি ২৯৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৪ ফুট প্রশস্ত দেলদুয়ার-লাউহাটী-সাটুরিয়া সড়ক নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ২০২৩ সালের ১৬ মার্চ তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ শুরু হয়। এর মধ্যে টাঙ্গাইল অংশের ২৪ দশমিক ৬৫০ কিলোমিটার সড়কের নির্মাণকাজ নেয় জয়েন্ট ভেঞ্চার প্রতিষ্ঠান আইসিসিএল ও র‍্যাব আরসি। মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া অংশের কাজ নেয় এনডিই নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পের কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৪ সালের ৩০ জুন। কিন্তু সেই সময়সীমা পেরিয়েও কাজ শেষ হয়নি। পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়।

    অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণকাজে ধীরগতি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের উদাসীনতা, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের দায়িত্ব পালনে গাফিলতি এবং ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতা প্রকল্প বাস্তবায়নকে ক্রমেই দুরূহ করে তোলে। কোথাও জমির মালিকরা অধিগ্রহণের টাকা না পাওয়ায় স্থাপনা সরাননি; ফলে রাস্তার কাজও এগোয়নি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আদালতে রিটের বিষয়টি। অর্থাৎ সড়ক নির্মাণের গতি থামাতে যেন একের পর এক জটিলতার পাথর এসে পড়েছে প্রকল্পের পথে।

    ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আব্দুল মান্নান জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তারা কোনো বিল পাচ্ছেন না। সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও বিল ছাড় করাতে পারেননি বলে দাবি তাঁর। তিনি আরও বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতার কারণে কাজের গতি সচল রাখা সম্ভব হয়নি। রাস্তার পাশের স্থাপনা অপসারণ না হওয়ায় অনেক জায়গায় নির্মাণকাজ করা যায়নি। নানা প্রতিকূলতায় কাজ বন্ধ হয়ে গেলেও নতুন করে কাজ শুরু করার সুযোগ পেলে তারা নির্মাণকাজ এগিয়ে নিতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।

    তবে সওজের বক্তব্যে চিত্রটি ভিন্ন। টাঙ্গাইল সড়ক ও জনপথ বিভাগের নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রকৌশলী বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর কাজের গতি স্তিমিত হয়ে পড়ে। বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও ঠিকাদাররা কাজ পুরোদমে শুরু করেননি এবং তাদের পাওয়া যাচ্ছিল না। এ কারণে আইসিসিএল ও র‍্যাব আরসির কার্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। নতুন করে পুনঃদরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ করে নির্মাণকাজ শেষ করা হবে বলেও জানান তিনি।

    এদিকে টাঙ্গাইল সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. সিনথিয়া আজমেরীর বক্তব্য জানতে ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে প্রকল্পের বিল, ভূমি অধিগ্রহণ, চুক্তি বাতিল এবং কাজ বন্ধ হওয়ার পেছনে প্রশাসনিক দায়-দায়িত্বের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।