• ঢাকা, বাংলাদেশ    
  • বৃহস্পতিবার , ২৬ জুন ২০২৫ ,৩রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • অপরাধ

    রাজিব-নজরুলের সিন্ডিকেটে ন্যায্য পাওনাও বিলম্বের খাঁচায় বন্দী

      নিজস্ব প্রতিনিধি ২৬ জুন ২০২৫ , ১১:১৫:৪৭ প্রিন্ট সংস্করণ

    চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয় বর্তমানে ঘুষের রসদে গঠিত এক দুর্নীতির দুর্গে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনার স্পর্শকাতর এ দপ্তরে যেন ঘুষ ছাড়া কোনো নথি নড়েও না, সরেও না। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ—এখানে চাকরি মানেই রাজস্ব লুণ্ঠনের লাইসেন্স, আর সেবা চাইলে ‘উপরি পাওনা’ পরিশোধে প্রস্তুত থাকাই রেওয়াজ।

    অভিযোগের তীর সোজা গিয়ে বিদ্ধ হয়েছে উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এ কে এম নজরুল ইসলাম এবং হিসাব নিরীক্ষণ কর্মকর্তা রাজিব কুমার দত্তের বুকে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন, বকেয়া বিল—সবই যেন ঘুষ বাণিজ্যের সুলভ বাজারদর অনুযায়ী মূল্যায়িত হয়। টাকার অঙ্ক নির্ধারিত থাকে পূর্বপরিকল্পিত হারে। কলেজ, স্কুল, প্রাথমিক শিক্ষা—সব খাতই এই দুর্নীতির বিস্তৃত চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে।

    সম্প্রতি ফটিকছড়ি সরকারি কলেজের ২৩ জন শিক্ষক-কর্মচারীর ১ কোটি ৯ লাখ টাকার এরিয়ার বিল ছাড় করতে গিয়ে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, পাঁচ শতাংশ ‘কমিশন’ না দিলে ফাইল অগ্রসর হবে না। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর শিক্ষকদের কাছ থেকে চার শতাংশ হারে ঘুষ আদায় করেই বিল ছাড় করে দপ্তর। এ ঘটনায় রাজিব কুমার দত্ত সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা। এমনকি বাকবিতণ্ডা ও উত্তেজনাও সৃষ্টি হয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে।

    এক শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা শিক্ষক মানুষ। বেতনটা যেন ভিক্ষার মতো চেয়ে নিতে হয়। তবু উপায় নেই, টাকা না দিলে অফিসের ফাইল যেন কুমিরের পেটে ঢুকে যায়।”

    এখানেই শেষ নয়—কাঞ্চননগরের ভুক্তভোগী মিলন নন্দী অভিযোগ করেন, “একটা সাধারণ চেক ছাড় করাতে গিয়ে অফিসের ঘরের পর ঘর ঘুরেছি। অবশেষে রাজিব নামক দুর্নীতিবাজের হাতে টাকা ধরিয়ে দিয়েই মুক্তি মেলে।” আরেকজন সরকারি কর্মচারী জানান, “মে মাসের বেতন জমা দেওয়ার পরও আমরা এখনো এপ্রিল মাসের বেতন পাইনি—ওরা ইচ্ছা করে বিল আটকে রাখে, যেন ঘুষ আদায়ের সময়সীমা দীর্ঘায়িত হয়।”

    শিক্ষা খাতে সীমাহীন এই দুর্নীতির শিকড় কত গভীরে, তা বোঝা যায় আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্যে—প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২২৯টি স্লিপ বিলেও প্রতিটি বিলের পেছনে ৫০০ টাকা করে ঘুষ দাবি করা হয়েছে। একাধিক শিক্ষক জানান, না দিলে হুমকি দিয়ে বলা হয়—‘বিল যাবে না, আর যদি যায়ও, পেনশন আটকে যাবে।’

    অডিট বিল, চূড়ান্ত বিল, জিপিএফ নম্বর খোলা—প্রতিটি ধাপে ঘুষ যেন বাধ্যতামূলক। এমনকি পেনশন ও আনুতোষিক বিল ছাড়ের জন্য ১৫-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়, যা সরাসরি শিক্ষকদের মর্যাদাকে অপমান করে।

    এই করুণ বাস্তবতার বিপরীতে ফটিকছড়ি উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী আহমদ মাস্টার বলেন, “রাষ্ট্রের দপ্তরে যদি এমন ঘুষের দানব ঘাঁটি গাড়ে, তাহলে জনগণ সেবা পাবে কোথায়? এটি কোনোভাবেই বরদাশত করা যায় না।”

    অবশেষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, “অভিযোগ পেলে আমরা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাব। এখনকার বাংলাদেশে দুর্নীতির স্থান নেই।” কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই কথার বাস্তব প্রতিফলন কবে ঘটবে?

    ফটিকছড়ির এ হিসাবরক্ষণ কার্যালয় এখন যেন এক ‘টাকার তেল-মেশিন’—যেখানে ঘুষ ঢাললে তবেই মেলে বেতন, পেনশন কিংবা ন্যায্য প্রাপ্য। আর না দিলে পড়ে থাকতে হয় মাসের পর মাস, বছর শেষেও পায়নি তার পাওনা। রাজিব-নজরুলের এই সিন্ডিকেট ভেঙে সৎ মানুষদের ফিরে পেতে চাই দৃঢ় রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ, না হলে এমন দুর্নীতির খাঁচায় আটকে থাকবে দেশের ভবিষ্যৎ।

    আরও খবর