প্রতিনিধি ২৪ জুন ২০২৫ , ২:৪৪:৫৪ প্রিন্ট সংস্করণ
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের (মসিক) নির্বাহী প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন—নামটা এখন দুর্নীতিরই আরেক ছদ্মনাম। বহুল আলোচিত সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ইকরামুল হক টিটুর ‘বিশেষ আস্থাভাজন’ এই প্রকৌশলী, যিনি পদটিকে বানিয়েছেন টাকার ছাপাখানা, আর মসিককে নিজের ব্যক্তিগত আখড়া। আওয়ামী আমলে প্রভাব খাটিয়ে গড়ে তুলেছেন বহুতল দুর্নীতির সাম্রাজ্য, আর সরকার বিদায়ের পরও বহাল তবিয়তে আছেন সরকারি ক্ষমতার সিংহাসনে।
জসিম উদ্দিন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের নজির দীঘি কাপাশাটিয়া গ্রামের আবু ছিদ্দিকের ছেলে। ঢাকা পলিটেকনিক থেকে ডিপ্লোমা করে, পরে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার হয়ে সরকারি চাকরিতে ঢোকেন আওয়ামী তদবিরে। ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে উঠে এসে তিনি পেয়েছেন যেন আলাদিনের চেরাগ—চাকরির বদলে দুর্নীতির টিকিট। গত এক দশকে গড়ে তুলেছেন শতকোটি টাকার সম্পদের পাহাড়, যা একজন সাধারণ প্রকৌশলীর আয়ের সঙ্গে বেমানান, বরং আপত্তিকর।
অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারদের সঙ্গে দেনদরবারে তিনি নির্ধারণ করে দিয়েছেন ৪০% কাটমানির অঘোষিত নিয়ম। মান বজায় না রাখলে নয়, বরং টাকায় কমতি হলে কাজ আটকে যায়। ময়মনসিংহ সদরের বলাশপুর, ছত্রপুর, বাড়েরা, মাসকান্দা, ত্রিশালের সাখুয়া—প্রতিটি মৌজায় রয়েছে তার ও তার স্ত্রীর নামে জমি। শুধু এসব জমির বাজারমূল্যই ১০ কোটির বেশি। মাসকান্দায় ৫ তলা ফাউন্ডেশনের বিলাসবহুল বাড়ি, ঢাকার মিরপুরে কোটি টাকার ফ্ল্যাট, প্রিমিও গাড়ি, স্ত্রীর নামে এফডিআর, সন্তানদের নামে কোটি টাকার বিমা—সবই তার অজানা টাকার উৎসের স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
বিশেষ চমক হলো মসিক সংলগ্ন পঞ্চনীড় টাওয়ারে স্ত্রীর নামে কেনা একটি সম্পূর্ণ ফ্লোর—তিনটি ইউনিট মিলে কোটি টাকার পঞ্চমতলার রাজপ্রাসাদ। ডিজাইন, সাজসজ্জা আর লাইটের বাহারে সেটি যেন আধুনিক রাজদরবার। অথচ এলাকাবাসী জানে না তাদের গ্রামের ছেলে এখন কোটি টাকার মালিক—তারা শুধু জানে সে ‘বড় চাকরি’ করে। মাসকান্দার স্থানীয় আফছর উদ্দিন জানালেন, বাড়িটি তিনি ভাড়া দিয়েছেন, নিজে থাকেন না। এলাকাজুড়ে তার সম্পদের বিস্তার নিয়ে মানুষ বিস্মিত, প্রশাসন নীরব।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জসিম উদ্দিনের ভাষ্য শুনে বিস্ময়ের সীমা থাকে না—তিনি বলেন, “আমার পদমর্যাদা অনুযায়ী যা করেছি, তা অতি সামান্য। আরও বেশি করার কথা ছিল।” সরকারি কর্মকর্তা হয়ে এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়—দুর্নীতির মূলে রয়েছে প্রশ্রয়, প্রভাব, আর প্রশাসনের নীরবতা।
বিভাগীয় কমিশনার ও মসিক প্রশাসক মোখতার আহমেদ এই বক্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন উল্লেখ করে বলেন, “সরকারি কর্মকর্তার মুখে এমন বক্তব্য অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—তদন্তের আশ্বাস আর চিরাচরিত সময়ক্ষেপণের মধ্য দিয়ে কত ‘জসিম’ আরও ফুলেফেঁপে উঠবে? দুর্নীতিকে যারা ‘পদমর্যাদা’ ভাবছে, তাদের মুখোশ এবার খুলে ফেলা জরুরি। নয়তো রাষ্ট্রের প্রতিটি দপ্তর একেকটি দুর্নীতির দুর্গে পরিণত হবে।











