এম এইচ মুন্না ৩১ মে ২০২৬ , ৩:৪২:৪৭ প্রিন্ট সংস্করণ
গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন বিভাগে কোটি কোটি টাকার কাজের টেন্ডার এমনভাবে প্রকাশ, দাখিল ও উন্মুক্ত করার অভিযোগ সামনে এসেছে, যেখানে পুরো প্রক্রিয়ার সময়সীমা ছিল মাত্র ২ ঘণ্টা, ৩ ঘণ্টা কিংবা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অভিযোগ পুরোনো হলেও সংশ্লিষ্টদের ভাষায়, “অনিয়মের বয়স হয় না”।
২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত গণপূর্ত অধিদপ্তরের আওতাধীন একাধিক বিভাগে এলটিএম (LTM) পদ্ধতিতে প্রকাশিত বিপুলসংখ্যক টেন্ডারের নথি ঘেঁটে দেখা গেছে। সরকারি দরপত্র ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য যেখানে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, সেখানে অভিযোগ উঠেছে, কিছু টেন্ডার এমনভাবে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, যাতে বাস্তবে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ছাড়া অন্য কারও অংশ নেওয়ার সুযোগই না থাকে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি করেছে ঢাকা পিডব্লিউডি ডিভিশন-৪। ওই সময় দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তারা ধারাবাহিকভাবে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে টেন্ডার প্রকাশ, জমা ও উন্মুক্ত করার সময় নির্ধারণ করেছেন। নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০ মার্চ ২০২৪ তারিখে প্রকাশিত টেন্ডার আইডি ৯৬৪৪৩০ ও ৯৬৪২৬৪ মাত্র ৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দাখিল ও খোলার জন্য নির্ধারণ করা হয়। একইভাবে ৩১ মার্চ ২০২৪ তারিখে টেন্ডার আইডি ৯৬৭৭৪৩ ও ৯৬৭৭৪৪ মাত্র ৪ ঘণ্টার ব্যবধানে নিষ্পত্তির জন্য রাখা হয়। ১৩ জুন ২০২৪ তারিখে টেন্ডার আইডি ৯৯৮৯৯১ মাত্র সাড়ে ৩ ঘণ্টার সময়সীমা রেখে প্রকাশ করা হয়। আর ১২ জুন ২০২৪ তারিখে টেন্ডার আইডি ৯৯৮৭৮২ মাত্র ২ ঘণ্টার ব্যবধানে জমা গ্রহণ ও খোলার সময় নির্ধারণ করা হয়, যা নিয়ে ঠিকাদার মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একটি প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রস্তুত করতে যেখানে দরপত্র নথি সংগ্রহ, রেট বিশ্লেষণ, ব্যাংক গ্যারান্টি প্রস্তুত, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই ও ই-জিপি আপলোডসহ নানা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়, সেখানে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কোটি টাকার টেন্ডার সম্পন্নের এই তাড়াহুড়া ছিল অত্যন্ত অস্বাভাবিক। তারা বলছেন, এসব সময়সীমা এমনভাবে নির্ধারণ করা হতো যাতে আগেভাগে প্রস্তুত থাকা নির্দিষ্ট ঠিকাদার গোষ্ঠী ছাড়া অন্যরা কার্যত অংশগ্রহণের সুযোগ না পায়।
আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগেও একই ধরনের অভিযোগের বিস্তর নজির মিলেছে। ২০২৩ সালের জুন মাসে ধারাবাহিকভাবে টেন্ডার আইডি ৮৪৫৮৮৮, ৮৪৫৮৮৯, ৮৪৫৮৯০, ৮৪৫৮৯১, ৮৪৫৮৯২, ৮৪৫৮৯৩, ৮৪৫৮৯৪ ও ৮৪৫৮৯৫ প্রকাশ করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সকাল ৯টায় টেন্ডার প্রকাশ করে বিকাল ৪টার মধ্যেই জমা ও খোলার সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। একাধিক ঠিকাদার জানান, বাস্তবে এত অল্প সময়ে একটি বৈধ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রস্তুত করা প্রায় অসম্ভব। তাদের অভিযোগ, এটি ছিল উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার আড়ালে নিয়ন্ত্রিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কৌশল।
একইভাবে বগুড়া গণপূর্ত বিভাগ, মানিকগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগ, সুনামগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগ, গোপালগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগ এবং ইএম ডিভিশন-৮ ও ইএম ডিভিশন-১১, ঢাকাতেও ঘণ্টাভিত্তিক টেন্ডার প্রকাশের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বগুড়া গণপূর্ত বিভাগে ১২ জুন ২০২৪ তারিখে টেন্ডার আইডি ৯৯৮৫৮৭ থেকে ৯৯৮৫৯২ পর্যন্ত একাধিক টেন্ডার মাত্র ২ ঘণ্টার ব্যবধানে সম্পন্নের জন্য নির্ধারণ করা হয়। শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-২ এ টেন্ডার আইডি ৯৯৮৩৮৩ মাত্র আড়াই ঘণ্টার সময়সীমা পায়। অন্যদিকে ইএম ডিভিশন-১১, ঢাকার কয়েকটি টেন্ডারে ২০ থেকে ২২ ঘণ্টার ব্যবধান রাখা হলেও অভিযোগ রয়েছে, সেখানেও অংশগ্রহণ কার্যত নিয়ন্ত্রিত ছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ওই সময় দায়িত্বে থাকা অনেক নির্বাহী প্রকৌশলী ইতোমধ্যে অন্যত্র বদলি হয়েছেন। কেউ পদোন্নতি পেয়ে নতুন দায়িত্বে গেছেন, কেউ অন্য বিভাগে স্থানান্তরিত হয়েছেন। কিন্তু বদলি হলেও তাদের সময়কার টেন্ডার কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্নের ভার কমেনি। বরং পুরোনো নথিপত্র ঘেঁটে এখন নতুন করে সামনে আসছে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার অস্বচ্ছতা, প্রভাববলয় ও নিয়ন্ত্রিত অংশগ্রহণের অভিযোগ।
সরকারি ক্রয়বিধিতে প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে কোটি টাকার কাজের টেন্ডার সম্পন্নের এসব অভিযোগ এখন নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে প্রকৌশলীক নৈতিকতা ও জবাবদিহি নিয়ে। সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকে বলছেন, যদি সরকারি দরপত্র ব্যবস্থাকেই বিশেষ গোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করার হাতিয়ারে পরিণত করা হয়, তবে রাষ্ট্রীয় ক্রয়ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ বিষয়ে সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও অধিকাংশই ফোন রিসিভ করেননি। কেউ কেউ মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।





