প্রতিনিধি ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৪:০৩:০৭ প্রিন্ট সংস্করণ
সিলেটের পাঠানপাড়ার মাটি ফুঁড়ে বের হওয়া এক রমরমা দখলবাজির সিন্ডিকেট আর সরকারি জমি গ্রাসের রূঢ় বাস্তবতায় অবশেষে টনক নড়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের। গত ২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার পড়ন্ত বিকেলে সওজের একদল পোড়খাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারী যখন সেই বিতর্কিত প্রাঙ্গণে পা রাখলেন, তখন সেখানে তৈরি হলো এক থমথমে রহস্যময় পরিবেশ। নথিপত্র আর দাপ্তরিক দলিলের মারপ্যাঁচ কড়ায়-গণ্ডায় মিলিয়ে তারা এক ফোঁটা সন্দেহ না রেখে নিশ্চিত হলেন যে, এই লোভনীয় ভূখণ্ডটির আসল ও অবিসংবাদিত দাবিদার কেবল রাষ্ট্র স্বয়ং অর্থাৎ সড়ক ও জনপথ বিভাগ। অথচ কী স্পর্ধা সেই ভূমিখেকোদের! রাষ্ট্রের রক্তচক্ষু ও প্রমাণের বেড়াজালকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উল্টো তাদেরই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর রোববার সকাল ঠিক দশটায় সওজ কার্যালয়ে দস্তাবেজ নিয়ে হাজির হওয়ার জন্য, যেন চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি।
এই কলঙ্কিত গল্পের সূত্রপাত ঘটেছিল গত ২৩ সেপ্টেম্বর বুধবার, যখন সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ-কুলাউড়া-মৌলভীবাজার মহাসড়কের তীর ঘেঁষে সওজের বেদখল হওয়া চার শতক পবিত্র জমিতে হঠাৎ করেই ইট-সিমেন্টের পৈশাচিক দেয়াল তোলার মহোৎসব শুরু হয়। পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের পদলেহনকারী স্থানীয় নেতা নাছির উদ্দিনের কুৎসিত ইশারায় এবং গুটিকয়েক হাড়সর্বস্ব মোসাহেবের প্রত্যক্ষ মদদে যখন সেই সীমানা প্রাচীর গড়ার কুৎসিত পাঁয়তারা চলছিল, ঠিক তখনই ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন adjacent দৈনিক জৈন্তাবার্তা কার্যালয় ও মোটর গ্যারেজের অপ্রতিরোধ্য কর্মীরা। কারণটা বড়ই পরিষ্কার; এই সরকারি গ্রাস করা মাটির ঠিক পিছন বুক জুড়েই রয়েছে যুক্তরাজ্য প্রবাসী বিদ্যোৎসাহী সমাজসেবী কাওছার আহমদ শিবলুর মালিকানাধীন ‘দৈনিক জৈন্তাবার্তা’র কার্যালয় এবং একটি আধুনিক কার ওয়াশ প্রতিষ্ঠান। মুহূর্তের মধ্যে রাজপথে সৃষ্টি হয় রক্তক্ষয়ী উত্তেজনার পারদ। খবর পেয়ে বিদ্যুৎগতির মতো ছুটে আসে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের মোগলবাজার থানার একদল চৌকস পুলিশ সদস্য। তারা এসে কেবল কাজই থমকে দেননি, বরং দম্ভভরে আস্ফালন করা দখলদারদের পরিষ্কার জানিয়ে দেন, যদি বুকের পাটায় জোর থাকে তবে সূর্যাস্তের আগেই কাগজপত্রের পসরা সাজিয়ে থানায় হাজিরা দিতে হবে।
তবে অনুসন্ধানের নির্মম জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বেরিয়ে এসেছে আরও এক ভয়ানক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য। ২৬নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর, মহানগর আওয়ামী লীগের চতুর নেতা তৌফিক বক্স লিপন এবং ২৬নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আখতার রশীদ চৌধুরীর অন্তরালবর্তী আঁতাত আর গোপন যোগসাজশের কুৎসিত জালেই রচিত হয়েছিল এই ভূমি দখলের নীল নকশা। গোদাটিকর মৌজার ১৯নং শিটের পবিত্র সরকারি খতিয়ান আর দালিলিক প্রমাণ বলছে, ৬৫০১নং দাগের ওই মূল্যবান ভূখণ্ডের একমাত্র আইনগত অভিভাবক বাংলাদেশ সরকারের সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। অথচ এই অসিত চক্রের লোভাতুর দৃষ্টি শুধু এখানেই থামেনি; এর ঠিক পেছনের ৬৫০৩নং দাগের বৈধ মালিক প্রবাসী কাওছার আহমদ শিবলু হলেও, বিএস জরিপের মৌজা ম্যাপ এবং প্রিন্ট পর্চার প্রতিটি ছত্রে এই অবৈধ দখলবাজদের লোলুপ জিহ্বার প্রমাণ স্পষ্ট।
এ ভূখণ্ডের ইতিহাস বড়ই বিচিত্র ও পঙ্কিল। প্রবাসী কাওছার আহমদ শিবলু এবং স্থানীয় বিশ্বস্ত সূত্রের গোপন সুড়ঙ্গপথ বেয়ে জানা যায়, এই ৬৫০১নং সরকারি খাস জমি গ্রাস করার এক গভীর কুৎসিত নেশা এই চক্রের মজ্জাগত বহুদিনের। বিগত ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি-জামাত জোট সরকারের অরাজকতার স্বর্ণযুগেও এই একই নরপিশাচ চক্র জোরপূর্বক এই সরকারি জমি দখল করে অবৈধ দোকানকোটা নির্মাণ করে লুটে নিয়েছিল লাখ লাখ টাকার ভাড়া। সময়ের পরিক্রমায় ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সেই ঐতিহাসিক সেনা অভিযানের কষাঘাতে তছনছ হয়ে যায় সেই অবৈধ সাম্রাজ্য। বীর সেনানিদের বুটের তলায় পিষ্ট হয়ে গুঁড়িয়ে যায় দখলদারদের আস্তানা, আর তৎকালীন সময়ে উদ্ধার হওয়া সেই ভূমি সওজ কর্তৃপক্ষের পবিত্র দায়িত্বে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
অবশেষে বৃহস্পতিবারের আকস্মিক ওই ঝটিকা অভিযানে সওজ কর্মকর্তারা সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে যেমন অবৈধ দেয়াল নির্মাণের ফানুস উড়িয়ে দিয়েছেন, তেমনি ২৭ সেপ্টেম্বরের ভাগ্যনির্ধারণী রোববারের সকালে চৌহাট্টাস্থ প্রধান কার্যালয়ে এক অদ্ভুত নাটকীয়তার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে গেছেন।





