• ঢাকা, বাংলাদেশ    
  • বৃহস্পতিবার , ২১ আগস্ট ২০২৫ ,৩রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • প্রকৌশল সংবাদ

    গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইএম কারখানা বিভাগে লুটের রাজত্বে নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ ইউসুফ 

      প্রতিনিধি ২১ আগস্ট ২০২৫ , ১:৪৫:১২ প্রিন্ট সংস্করণ

    রাষ্ট্রের নামে বরাদ্দকৃত অর্থ যখন দুর্নীতির লালায় গলিয়ে ফেলা হয়, তখন বোঝা যায়- দপ্তর নয়, এটি এক একটি সিন্ডিকেট কায়েমের কারখানা। ঠিক তেমনি দুর্নীতির দুর্গে রূপ নিয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল-মেকানিক্যাল (ইএম) কারখানা বিভাগ, যার শীর্ষে অবস্থান করছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ ইউসুফ। অফিসে তার দেখা পাওয়া যেন মরুভূমিতে মরীচিকা- অস্তিত্ব আছে, দেখা মেলে না।

    ইউসুফের বিরুদ্ধে রয়েছে ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য, চুক্তিভিত্তিক কাজ ভাগাভাগির অভিযোগ। ক্ষমতা আর গোপন লেনদেনের বলয়ে আবদ্ধ এই কর্মকর্তা সরকারি দপ্তরকে গড়েছেন ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির যন্ত্রে। নির্দিষ্ট কমিশন ছাড়া তিনি কোনো কাজ করেন না- আর কমিশনের হার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ, যা বাধ্যতামূলক চাঁদার মতো আদায় করেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কাছ থেকে।

    অফিসে না বসে বাইরে থেকে প্রকল্পের নামে কমিশন আদায়ের ব্যবসা চালানোই তার নিয়মিত রুটিন। ঠিকাদারদের বিল আটকে রেখে মোটা অংকের উৎকোচ আদায়, কাজ না করেই পুরো বিল উত্তোলন, দপ্তরের ভেতরে-বাইরে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গঠন এবং পদায়ন বাণিজ্যের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন দুর্নীতির এক অদৃশ্য জাল, যা প্রশাসনের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত।

    সম্প্রতি এক ঠিকাদারের কাছ থেকে ৩৫ লাখ টাকা ঘুষ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে সরকারকে প্রকল্প হস্তান্তর করা হয়েছে প্রায় দুই বছর আগেই। কিন্তু বিল এখনো আটকে। এ চিত্র বিচ্ছিন্ন নয়- বরং নিয়মিত।

    ইউসুফ শুধু নিজে নয়, তার আশপাশে গড়ে তুলেছেন এক সংঘবদ্ধ চক্র। সহযোদ্ধা হিসেবে রয়েছে উপসহকারী প্রকৌশলী মিল্টন কুমার দাস- একজন ঘুষখোর প্রকৌশলী যার বিরুদ্ধে রয়েছে ভয়াবহ পরিমাণ দুর্নীতির অভিযোগ। সরকারি বরাদ্দের মালামাল এক প্রকল্পের নামে কেনা হলেও তা ব্যবহার করা হয় অন্য প্রকল্পে। মালপত্রের অতিরিক্ত সরবরাহ করিয়ে অন্য ঠিকাদারের কাছে তা বিক্রি করে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ মিলেছে একাধিকবার।

    ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একাধিক প্রকল্প- সংসদ সচিবালয়ের ১১২ ফ্ল্যাট, আবহাওয়া অধিদপ্তর, বিডা, সমাজসেবা, বিআইসিসি, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, শিশু হাসপাতালসহ সরকারি ও আধা-সরকারি দপ্তরের যন্ত্রপাতি, এসি, ফায়ার সিস্টেম, লাইটিং, এলইডি ডিসপ্লে—সব কিছুতেই চলছে গোঁজামিল দিয়ে বরাদ্দ আত্মসাৎ। কাজ না করেই উঠানো হয়েছে মোটা অংকের বিল, যা ভাগ হয়েছে সিন্ডিকেটের মধ্যে।

    এই সিন্ডিকেট এখন এতটাই বেপরোয়া যে, তারা মন্ত্রী-সচিবের নাম পর্যন্ত ব্যবহার করে নিজেদের ক্ষমতা জাহির করে। খোদ উপদেষ্টার নামও রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি তাঁর আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে ইউসুফ গং।

    ইএম কারখানা বিভাগকে ‘টাকার খনি’ মনে করে পোস্টিং নিতে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন এই কর্মকর্তারা। নিজেরাই বলেন, “পোস্টিংয়ে ১০ লাখ খরচ করেছি- তিন মাসেই উঠে আসবে।” এ ধরনের কথার মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়, দপ্তরগুলো আজ দুর্নীতির ব্রোকারদের হাতে বন্দী।

    অথচ গণমাধ্যম কিংবা অনুসন্ধানকারীরা যখন এই অপকর্ম তুলে ধরতে চান, তখন ইউসুফ হন বেপাত্তা। ফোনে পাওয়া যায় না, অফিসে গেলে চেয়ার খালি। দপ্তরজুড়ে ফিসফাস- “স্যার অফিসে বসেন না, আপনি কোথা থেকে পাবেন?”

    চলবে…