• ঢাকা, বাংলাদেশ    
  • মঙ্গলবার , ১১ মার্চ ২০২৫ ,৩রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • অপরাধ

    স্নায়ু বিকাশ প্রতিবন্ধীদের সুইড বাংলাদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা লোপাট

      প্রতিনিধি ১১ মার্চ ২০২৫ , ১২:৩৮:০০ প্রিন্ট সংস্করণ

    স্টাফ রিপোর্টার: “সোসাইটি ফর দ্য ওয়েলফেয়ার অব দ্য ইনটেলেকচুয়ালি ডিজএবল্ড বাংলাদেশ” (সুইড বাংলাদেশ) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৭ সালে। স্নায়ু বিকাশ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে সমাজে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, কর্মসংস্থান, পুনর্বাসন, আত্মনির্ভরশীলতা ও অধিকার আদায়ের নিমিত্তে কাজ করার ভিশন নিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সুইড বাংলাদেশ’।

    প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। মূলত হাসিনা স্বৈরাচার সরকারের মদদপুষ্ট কতিপয় সদস্য এই প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

    প্রতিষ্ঠানটির অনিয়ম ও দুর্নীতির মধ্যে অন্যতম হলো সুইড বাংলাদেশের মেন্টর পদের কোনো উল্লেখ না থাকলেও, এখানে মেন্টর হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত আছেন জওয়াহেরুল ইসলাম মামুন। তিনি সুইড বাংলাদেশে অর্থ লোপাটকারী হিসেবে পরিচিত। তিনি প্রতি মাসে ৮০ হাজার টাকা বেতন উত্তোলন করেন।

    জওয়াহেরুল ইসলাম মামুন বেশ কয়েক বছর ধরে মেন্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং প্রতি মাসে ৮০ হাজার টাকা উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এ ধরনের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সদস্যপদ স্থগিত করার বিধান থাকলেও, মামুন তা করেননি। এ বিষয়ে তার মতামত জানতে চাইলে তিনি সদস্যপদ স্থগিত করেছেন বলে দাবি করেন।

    এই প্রতিষ্ঠানে মেন্টর মামুন তার আত্মীয়-স্বজন ও নিজের এলাকার লোকজন নিয়োগ দিয়ে স্বজনপ্রীতি করেছেন। চাকরি হারানোর ভয়ে এসব বিষয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।

    ১৯-৩-২০১৯ তারিখে মোঃ লোকমান হোসেনকে ড্রাইভার হিসেবে ১৮,০০০ টাকা বেতনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ৩০,২৩০ টাকা বেতনে তাকে চাকরিতে নিয়মিত করা হয়। তারপর ২৫/৪/২০২১ তারিখে লোকমান হোসেনকে কোনো নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে কেয়ারটেকার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

    অফিসের অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে খারাপ আচরণের অভিযোগ রয়েছে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের মদদপুষ্ট লোকমানের বিরুদ্ধে। লোকমানের সকল দুর্নীতির প্রশ্রয়দাতা মেন্টর জওয়াহেরুল ইসলাম মামুন ও মহাসচিব মাহবুবুল মনির।

    সুইড বাংলাদেশের বর্তমান মহাসচিব মাহবুবুল মনির এককভাবে প্রতিষ্ঠানটিতে তার আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছেন। প্রতিষ্ঠানটির ক্রয় সংক্রান্ত পারচেজ কমিটি ২০২২ সালের শেষের দিকে স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে বিলুপ্ত করেন তিনি ও মেন্টর মামুন।

    লোকমানের মাধ্যমে মেন্টর ও মহাসচিব সকল আর্থিক অনিয়ম করে থাকেন বলে সুইড অফিসের পিয়ন থেকে শুরু করে কর্মকর্তাদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তবে মেন্টর কর্তৃক চাকরি হারানোর ভয়ে অফিসের কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।

    মাহবুবুল মনির একসাথে সুইডের ধানমন্ডি শাখার সভাপতি, প্রতিবন্ধী ফোরামের ভাইস প্রেসিডেন্ট, কেয়ারাসের সভাপতি এবং সুইড বাংলাদেশের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যা প্রতিষ্ঠানটির গঠনতন্ত্রের পরিপন্থী। একাধিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার কারণে সুইড বাংলাদেশের মতো মানবিক সংগঠনে তিনি পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। মূলত তার হয়ে অফিস পরিচালনা করেন মেন্টর মামুন।

    সুইডের প্রেসিডেন্ট ফরিদ আহমেদ অফিস পরিবহনের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ৩৪ লক্ষ টাকা মূল্যের একটি মাইক্রোবাস অনুদান হিসেবে প্রদান করেন, যার নাম্বার ঢাকা মেট্রো চ-৫৬-৩৯০৪। এই মাইক্রোবাসটি অফিসের কাজে ব্যবহৃত হওয়ার কথা থাকলেও, মহাসচিব এককভাবে নিজের স্বার্থে এটি ব্যবহার করেন। এমনকি তার ছেলের বিয়েতেও এই গাড়ি ব্যবহার করা হয়েছে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে ফোন করা হলে, তিনি নামাজের কথা বলে ফোন রেখে দেন।

    সুইড বাংলাদেশের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ফরিদ আহমেদ সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। গুঞ্জন উঠেছে, সুইডের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম, দুর্নীতি, কোটি কোটি টাকা লুটপাট, প্রতিষ্ঠানটির আত্মীয়করণ, মেন্টর ও মহাসচিবের স্বেচ্ছাচারিতার কারণেই তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি ইতোমধ্যে সুইড বাংলাদেশকে বিভিন্ন সময়ে প্রায় দেড় কোটি টাকা অনুদান প্রদান করেছেন, যা যথাযথভাবে ব্যবহার হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি তার অনুদানকৃত গাড়ি সম্পর্কিত বিভিন্ন অনিয়মের তদন্তও হয়েছে সুইড বাংলাদেশে। এসব বিষয়ে সভাপতির সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও, তাকে পাওয়া যায়নি।

    সুইড বাংলাদেশ অফিস এবং অভিভাবকদের পক্ষ থেকে জানা গেছে, মেন্টর মামুন ও মহাসচিব মনিরের সকল অপকর্ম আড়াল করতে সুইড বাংলাদেশের সহ-সভাপতি মোঃ শাহ আলম, সাংস্কৃতিক সচিব রাশিদা জেসমিন রোজী, অর্থ সচিব জোবায়েদুর রহমান মিলন, ফকির মোঃ সোহেলসহ কয়েকজন কর্মকর্তা সক্রিয়ভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

    সহ-সভাপতি মোঃ শাহ আলমের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর স্বনামধন্য উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল থেকে তিনি দুর্নীতির দায়ে চাকরিচ্যুত হন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক মদদে ঐ প্রতিষ্ঠানটির সভাপতির পদ গ্রহণ করেন এবং তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, চাকরি বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। তিনি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের নেতা ডাঃ ইকবালের প্রতিষ্ঠিত ভৈরবের একটি কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানেও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুইড বাংলাদেশ পরিচালিত কলেজ কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন মোঃ শাহ আলম।