• ঢাকা, বাংলাদেশ    
  • শুক্রবার , ৩১ জুলাই ২০২৬ ,৪ঠা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • প্রকৌশল সংবাদ

    সরকারি তকমার আড়ালে গণপূর্তের প্রকৌশলীদের আবাসন সিন্ডিকেট

      নিজস্ব প্রতিনিধি ৩১ জুলাই ২০২৬ , ৬:১৭:৩৯ প্রিন্ট সংস্করণ

    রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চরম অপব্যবহার, বৈষয়িক লালসা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পদের অনৈতিক ব্যবহারের এক নজিরবিহীন পরাকাষ্ঠা দৃশ্যমান গণপূর্ত অধিদপ্তরের একদল উচ্চাভিলাষী প্রকৌশলীর কর্মকাণ্ডে। সরকারি চাকরিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিধিবহির্ভূত উপায়ে বিপুল অর্থ-সম্পদ উপার্জন এবং সেই অর্জিত অবৈধ পুঁজি দিয়ে রিয়েল এস্টেট খাতসহ নানা অভিযোগ উঠেছে সংঘবদ্ধ প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে।

    ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’ এবং ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’-এর সুস্পষ্ট আইনি অলঙ্ঘনীয়তাকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সাভার, উত্তর গোলার্ধের ঢাকা, গাজীপুর ও ধামরাই জুড়ে এরা ছড়িয়ে দিয়েছে তাদের অপরাধমূলক অর্থনীতির বিষাক্ত ডালপালা। সরকারের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব গ্রহণ আইনতঃ চাকরিচ্যুত করার মতো গুরুতর অসদাচরণ হলেও, এই মাফিয়া চক্রটি আইনের ফাঁক গলে বহাল তবিয়তে তাদের সমান্তরাল অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করে আসছে।

    এই সিন্ডিকেটের মূল অনুঘটক বা মাস্টারমাইন্ড গণপূর্ত সাভার ডিভিশনের উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার খান আনু এবং শেরেবাংলা নগর ১নং বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান। ২০১৬ সালে সাভার ডিওএইচএস এলাকায় এই অশুভ আর্থিক নেটওয়ার্কের বীজ বপন করা হয়। পরবর্তীতে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্জিত অবৈধ কাঁচা টাকার প্রলোভনে এই সিন্ডিকেটে যুক্ত হন ই/এম বিভাগ-৬ এর সহকারী প্রকৌশলী আবুল বাশার, ঢাকা ই/এম জোনের উপসহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আব্দুর রউফ এবং ঢাকা গণপূর্ত ই/এম সার্কেল-৩ এর সহকারী প্রকৌশলী গোল নাহার (প্রকৌশলী আবুল বাশারের স্ত্রী)।

    আইনি জবাবদিহিতা এড়াতে তারা ‘কাজল’ নামক এক ছদ্মবেশী ঠিকাদারকে সমসাময়িক কর্পোরেট ফ্রন্ট হিসেবে দাঁড় করিয়ে ‘ডালাস ডেভেলপারস অ্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেড’ নামীয় সংস্থার আড়ালে ফ্ল্যাট ও আবাসন বাণিজ্য পরিচালনা করছেন। মাঠপর্যায়ে কাজের তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে মিজানুর রহমানের অনুজ জুয়েল এবং আনোয়ার খান আনুর অনুজ রাজু। একইসাথে উত্তরা অঞ্চলে জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের অবৈধ তহবিল আকর্ষণ ও সঞ্চালনের উদ্দেশ্যে এই দুই সহোদরের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে ‘ফিউচার ড্রিম বিল্ডার্স লিঃ (এফডিবিএল)’ নামের অপর এক ব্যবসায়িক ভেঞ্চার।

    জানা যায়, তাদের অনৈতিক স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের সচিত্র খতিয়ান। সাভার নবীনগর ডিওএইচএস-এর ৬ নম্বর রোডের ১১৮ ও ১১৯ নম্বর প্লটে বহুতল অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন করে অধিকাংশ এপার্টমেন্ট হস্তান্তরিত করা হয়েছে। আরও জানা যায়, ১১৯ নম্বর ভবনে অভিযুক্ত পাঁচ প্রকৌশলীর যৌথ মালিকানাধীন রাজকীয় বিলাসবহুল স্টুডিও এপার্টমেন্ট বিদ্যমান, যা তাদের রাজকীয় জীবনযাপনের গোপন আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া ৩ নম্বর রোডে ১টি এবং ৯ নম্বর রোডের ২৬৯, ২৭০ ও ২৭১ নম্বর প্লটে বৃহৎ পরিসরে নির্মাণযজ্ঞ চলমান, যেখানে ফ্রন্ট লাইনের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে উন্মুক্ত ফ্ল্যাট বিক্রির কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। আর প্রশাসনিক আইনি প্রক্রিয়ার চোখ ফাঁকি দিতে মিরপুর ডিওএইচএসের ৯৬৯ নম্বর ভবনে (রোড-১৫, এভিনিউ-২) স্থাপন করা হয়েছে উচ্চমানের কর্পোরেট হেডকোয়ার্টার।

    অর্থনৈতিক অপরাধের সবচেয়ে আশঙ্কাজনক অধ্যায়টি রচিত হয়েছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের (উত্তরা-আশুলিয়া-বাইপাইল-ইপিজেড অংশ) ক্ষতিপূরণ ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মূল্যায়ন (ভ্যালুয়েশন) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে। দীর্ঘ ১২ বছর সাভারে এবং ১০ বছর স্মৃতিসৌধের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত থাকার সুবাদে আনোয়ার খান আনু ও মিজানুর রহমান জালিয়াতির এক অভেদ্য নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। জামগড়া এলাকায় ব্যক্তিগত গোপন দপ্তর খুলে সান্ধ্যকালীন সময়ে শিল্পপতিদের সাথে ক্ষতিপূরণের অংক কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেওয়ার বিনিময়ে চলত দরকষাকষি। জামগড়ার একটি তৈরি পোশাক কারখানার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৩ কোটি টাকা নির্ধারিত হলেও, স্বচিত নথি জালিয়াতির মাধ্যমে তা দেখানো হয় ১৬ কোটি টাকা! আর এই কৃত্রিম মূল্যায়নের মাধ্যমে অর্জিত লভ্যাংশ থেকে কেবল একটি একক চুক্তি থেকেই তারা পকেটে পুরেন ৮ কোটি টাকার নগদ উৎকোচ। কেবল এই ভ্যালুয়েশন জালিয়াতি থেকেই এই দুই প্রকৌশলীর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে স্থায়িত্ব পায় শতাধিক কোটি টাকার অনৈতিক মূলধন।

    উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানের গতিবিধি আন্তর্জাতিক অপরাধ চেইন ও অফশোর সম্পদের সাথে সম্পর্কিত। একাধিক জালিয়াতি ও অসত্য তথ্যে তৈরি পাসপোর্টের ভিত্তিতে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় তার নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। তথ্য প্রমাণ ইঙ্গিত করে, কানাডার বিতর্কিত ‘বেগমপাড়ায়’ তার নামে বিলাসবহুল স্থাবর সম্পত্তি অর্জিত হয়েছে। পাশাপাশি ‘ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন’ (স্বত্বাধিকারী আব্দুস সালাম)-এর ব্যানারে গণপূর্তের বড় বড় প্রকল্পে রয়েছে তার শতকোটি টাকার বেনামী বিনিয়োগ। বাহ্যিকভাবে অত্যন্ত সাদামাটা চলনের এই কর্মকর্তা সহকর্মীদের কাছে দম্ভ করে বলেন, “নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে বড় বড় স্যারেরা আমার কথায় ওঠবস্ করেন।”

    অন্যদিকে, প্রকৌশলী আবুল বাশার ও তার সহধর্মিণী গোল নাহার দম্পতি জাতীয় স্মৃতিসৌধ, বিপিএটিসি ও হেলথ ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের মেগা প্রজেক্টের অর্থ তছরুপ করে সাভার রেডিও কলোনি সংলগ্ন এলাকায় নির্মাণ করেছেন প্রাসাদোপম ছয়তলা ভবন। উপরন্তু সাভার, গাজীপুর ও ধামরাই জুড়ে তাদের নামে-বেনামে থাকা অর্ধশত কোটি টাকার স্থাবর সম্পত্তি, ড্রেজার বাণিজ্য, রিটেইল মার্কেট ও গার্মেন্টস খাতের বিপুল বিনিয়োগের সুস্পষ্ট অভিযোগও উঠেছে।

    বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, সাভার ডিওএইচএস এলাকায় নিবিড় সার্ভেইল্যান্স পরিচালনা করে। তদন্তের চূড়ান্ত পর্যায়ে ছদ্মবেশী ফ্ল্যাট ক্রেতার রূপ ধারণ করে পরিচালনা করা হয় এক কৌশলগত ‘স্ট্রিং অপারেশন’। ৪টি আবাসন ইউনিট ক্রয়ের প্রস্তাব দিয়ে যোগাযোগ করা হলে, অভিযুক্তগণ স্বীয় ক্ষমতার প্রভাব এবং ব্যবসাটিতে তাদের প্রত্যক্ষ ইক্যুইটি ও মালিকানার কথা স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করে নেন।