নিজস্ব প্রতিনিধি ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩ , ১০:৫০:০৫ প্রিন্ট সংস্করণ
যশোর জেলা খাদ্য বিভাগের শ্রম ও হস্তার্পন ঠিকাদারি নিয়ে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক একজন ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে বছরের পর বছর ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া বন্ধ করে রেখেছেন। এতে করে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
জানা গেছে, খাদ্য গুদামে ধান-চাল লোড-আনলোডের জন্য শ্রম ও হস্তার্পন ঠিকাদার নিয়োগ করে থাকে খাদ্য বিভাগ। নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি দুই বছর অন্তর অন্তর এ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। চলমান ঠিকাদারের মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন মাস আগে থেকে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়। কোন কারণে নিয়োগ সম্ভব না হলে আগের ঠিকাদারের কাজের সময়সীমা তিন মাস বাড়ানো যায়। এরপরও নিয়োগ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হলে মাস্টার রোলে শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানোর কথা। কিন্তু এ নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে যশোর জেলার দশটি খাদ্য গুদামে একই ঠিকাদার দিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে বছরের পর বছর।
স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ, চার বছর আগে খুলনার ঠিকাদার সেলিম রেজা লোটাস কাজ পান। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর তিনি জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে অনৈতিকভাবে ম্যানেজ করে সময়ক্ষেপণ করতে মামলার আশ্রয় নেন। মামলায় খাদ্য নিয়ন্ত্রককে বিবাদী করা হলেও তিনি ওই মামলা নিষ্পত্তির কোন উদ্যোগ নেননি। সেই সঙ্গে মাস্টার রোলে কাজ করানোর উদ্যোগ বন্ধ করতে শ্রমিকদের জাল স্বাক্ষর সম্বলিত আবেদনকে পুঁজি করে তিন মাস অন্তর অন্তর সময় বাড়িয়ে কাজ অব্যাহত রেখেছেন। এতে করে স্থানীয় ঠিকাদাররা দীর্ঘদিন কাজ না পেয়ে যেমন বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি বাড়তি রাজস্ব আয়ের সুযোগ হারাচ্ছে সরকার।
যশোর খাদ্য বিভাগের ঠিকাদার মোকছেদ আলী খান বাবু বলেন, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিত্যনন্দ কুণ্ডু খাদ্য বিভাগকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন। শ্রমিক ও পরিবহন টেন্ডার দুই বছর পর পর হওয়ার কথা থাকলেও উনি চার বছরের বেশি সময় ধরে টেন্ডার করছে না। বর্তমান ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজোশ করে মামলা দিয়ে টেন্ডার বিলম্বিত করছেন। মামলা নিষ্পত্তির কোন উদ্যোগ নিচ্ছেন না খাদ্য নিয়ন্ত্রক। আদালত ১২ বার নোটিশ করেও তার কাছ থেকে কোন সাড়া পাননি। পরে আদালত তার বিরুদ্ধে সমন জারি করলে তিনি সরকারি আইনজীবীকে এ মামলা পরিচালনার জন্য চিঠি দেন।
তিনি আরও বলেন, খাদ্য নিয়ন্ত্রক প্রতি তিনমাস অন্তর অন্তর সময় বৃদ্ধি করে ঠিকাদারকে বিল দিয়ে যাচ্ছেন। যা সম্পূর্ণ বেআইনি। এতে সাধারণ ঠিকাদাররা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
ঠিকাদার তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, মন্ত্রণালয়ের এমন কোন নির্দেশনা নেই যে টেন্ডার না করে একজনকে দিয়ে সময় বৃদ্ধি করে কাজ করা যাবে। খাদ্য নিয়ন্ত্রক অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এ কাজ করছেন। এর নিরসন দরকার; যাতে আমরা সাধারণ ঠিকাদাররা বঞ্চিত না হই।
যশোরে জেলা খাদ্য গুদাম থেকে ধান-চাল লোড-আনলোড করছেন শ্রমিকরা। ছবি: সময় সংবাদ
ঠিকাদার নন্দ লাল সাহা বলেন, দীর্ঘ চার বছর কোন টেন্ডার হচ্ছে না। লোটাস এন্টারপ্রাইজ দুই বছরের স্থলে গত চার বছর ধরে কাজ করছে। এ কাজে তাকে সহায়তা করছেন খাদ্য নিয়ন্ত্রক। কেবল টেন্ডার না, ধান-চাল ক্রয়েও দুর্নীতি করছেন খাদ্য নিয়ন্ত্রক। আমরা চাচ্ছি খাদ্য বিভাগ যাতে দুর্নীতিমুক্ত হয় এবং সব ঠিকাদার টেন্ডারে অংশগ্রহণের মাধ্যমে কাজ পান, সে ব্যবস্থা করা হোক।
এদিকে শ্রমিকদের স্বাক্ষর জাল-জালিয়াতির যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা সত্য বলে জানিয়েছেন খাদ্যগুদামের কর্মরত শ্রমিকরা।
যশোরের মণিরামপুর খাদ্য গুদামের শ্রমিক সরদার শের আলী বলেন, ‘শ্রমিকদের দিয়ে মাস্টার রোলে কাজ না করিয়ে ঠিকাদারের সময়বৃদ্ধি করা হোক- এমন কোন দরখাস্তে আমি সই করিনি। যে সই দেখাচ্ছেন ওটা জাল। ঠিকাদার জাল করেছে। মাস্টার রোলে কাজ হলে আমাদের লাভ। আমরা টনপ্রতি ৫০ টাকা মজুরি পাবো। ঠিকাদারের কাজ করলে মাত্র ১৪ টাকা পাওয়া যায়। আমরা কেন মাস্টার রোল বন্ধ করতে চাইবো।’
শুকুর আলী আলী নামে অপর এক শ্রমিক বলেন, ‘আমাকে ঠিকাদার কোনদিন কোন কাগজে স্বাক্ষর করতে বলেনি। এ স্বাক্ষর আমার না। আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, যশোরের ১০টি খাদ্য গুদামের সব শ্রমিকের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। এ কাজ টিকাদার করেছে।’
হোসেন আলী নামে অপর এক শ্রমিক বলেন, ‘কোন স্বাক্ষর করিনি। আমাদের সরদারও জানে না। যা জমা দেয়া হয়েছে, সব জাল।’
তবে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিত্যনন্দ কুণ্ডু অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, ঠিকাদার নিয়োগ কেন ঝুলে গেছে তা আগের অফিসার বলতে পারবেন। তাছাড়া মাস্টার রোলের যে সিদ্ধান্ত তা পরে সেটা বাতিল করেছে মন্ত্রণালয়। তা ছাড়া একটি মামলাও হয়েছে। ফলে ঠিকাদারের আবেদনের প্রেক্ষতে সময় বৃদ্ধি করে কাজ চালানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, মামলাসহ যেসব জটিলতার কারণে ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া সম্ভব হচ্ছিলো না তার সমাধান হয়েছে। আইনজীবীর মতামত পাওয়া গেছে। শিগগিরই নতুন ঠিকাদার নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হবে।
জেলা খাদ্য বিভাগের তথ্য মতে, বর্তমান ঠিকাদার সেলিম রেজা ২০১৯-২০ ও ২০২১-২২ অর্থ বছরের জন্য কাজ পায়। সেসময় তারা খাদ্য বিভাগ থেকে ১ কোটি ৮৮ লাখ ৯৭০ টাকা বিল উত্তোলন করে। এখন পর্যন্ত আরও ১ কোটি ৫৩ লাখ ১৭ হাজার ৫৪৬ টাকা বিল উত্তোলন করেছে।





