নিজস্ব প্রতিনিধি ৩ জুলাই ২০২৫ , ৯:৫১:২৩ প্রিন্ট সংস্করণ
চাকরিজীবনে ধর্ষণের মতো জঘন্য অভিযোগে কলঙ্কিত, দুর্নীতির পাহাড়সম প্রমাণে দগদগে, প্রশাসনিকভাবে একবার বরখাস্ত হওয়া মোঃ জামানুর রহমান এখন নাকি পদোন্নতির দৌড়ে! জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (গ্রেড-৪) পদে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে যেভাবে তিনি ছলচাতুরী ও পৃষ্ঠপোষকতার আশ্রয়ে উঠে এসেছেন, তা যেন রাষ্ট্রযন্ত্রকে কষাঘাতে বিদ্ধ করার সামিল।
সদ্য সাবেক প্রধান প্রকৌশলী তুষার মোহন সাধু খাঁ যিনি নিজেও পদোন্নতির প্রস্তাবিত তালিকার প্রস্তুতকারক, তিনিই আবার বিতর্কিত জামানুরের এক নম্বর সুপারিশকারী! মূল গ্রেডেশন লিস্ট প্রস্তুতের আগেই ২৮ জনের প্রস্তাবিত তালিকা জমা দেন তিনি—যেখানে উঠে আসে ধর্ষণ, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে বারবার গণমাধ্যমের শিরোনাম হওয়া জামানুরের নাম। বিষয়টি যেন রাজনীতির ছত্রছায়ায় গজিয়ে ওঠা আমলাতান্ত্রিক দুর্বৃত্তায়নের এক রূঢ় দৃষ্টান্ত।
দুদক কর্তৃক ২০২২ সালের তদন্তে পাবনার সুজানগর, ভাঙ্গুরা ও চাটমোহর পৌরসভার পানির প্রকল্পে অর্থ আত্মসাৎ, কাজ না করে বিল তুলতে গিয়ে প্রকল্পকে কাগজে-পত্রে বাস্তবায়ন দেখানোর প্রতারণা এবং পরে অচলাবস্থায় ফেলে রাখার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। এমনকি স্থানীয় সরকার বিভাগের নিজস্ব তদন্তেও জামানুরের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও প্রকল্প জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু সেই বরখাস্ত আদেশও শেষপর্যন্ত রহস্যজনকভাবে প্রত্যাহার করে স্বপদে ফিরিয়ে আনা হয় তাকে।
এতটুকুতেই শেষ নয়। জামানুর রহমানের বিরুদ্ধে রয়েছে এক তরুণীকে ৭ বছরের বেশি সময় আটকে রেখে ধর্ষণের গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ডুয়েট-এ ভর্তি হতে যাওয়া ওই তরুণীকে মোহাম্মদপুরের একটি হোটেলে কার্ডের অজুহাতে ডেকে নিয়ে প্রথমবার ধর্ষণ করেন জামানুর। এরপর ‘চাকরি দেবে’ মর্মে প্রতারণা করে তার বাবা-মাকে প্রভাবিত করে তরুণীকে গৃহবন্দী করে দীর্ঘ সময় ধরে ধর্ষণ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালান। অভিযোগ রয়েছে, এক পর্যায়ে তরুণীকে মানসিক রোগী বানিয়ে পাবনা হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেন, জিম্মি করা হয় তার পরিচয়পত্র, সার্টিফিকেট, ফোন ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র। এমনকি ইনজেকশন দিয়ে অচেতন করে রাখা এবং শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার অভিযোগও রয়েছে।
সবশেষে আদালতের শরণাপন্ন হয়ে পিবিআই’র সহায়তায় তরুণী উদ্ধার হয় এবং বিস্তারিত ২২ দফা জবানবন্দি দেন তিনি। রাজশাহী প্রেস ক্লাবের সামনে ধর্ষণবিরোধী মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন এবং গণমাধ্যমে একাধিক অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন সত্ত্বেও জামানুর রহমানকে পুনর্বহাল করে রাষ্ট্র যেন ধর্ষকের পাশেই দাঁড়ালো।
প্রশ্ন জাগে—তাহলে এত অভিযোগ, তদন্তে প্রমাণ, গণমাধ্যমে মুখরতা—সবই কি আজ নিষ্ফল? নাকি ‘তুষার মোহন সাধু’ নামক ছায়াপ্রভুর ইঙ্গিতে সবই ধূলিসাৎ?
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে এখনো ক্ষোভের বিস্ফোরণ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জামানুর রহমান নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে উপরমহলকে ম্যানেজ করেছেন। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়, দুদক ও আদালতের নথিভুক্ত অভিযোগের পাহাড়। এমন ব্যক্তিকে পদোন্নতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা মানে রাষ্ট্রের বিচারবোধে থুথু ছিটানো।
এই বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মোহাম্মদ রেজাউল মাকসুদ জাহেদীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি অনুপলব্ধ ছিলেন। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী তুষার মোহন সাধুর সঙ্গেও একাধিক নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তাঁদের এই নীরবতা কি সম্মতির প্রতিচ্ছবি? নাকি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অংশ?
জনগণের করের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রে ধর্ষণ ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত একজন ব্যক্তির পদোন্নতির অপচেষ্টা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ক্যান্সার। এই ক্যান্সার নির্মূলে দায় শুধু প্রশাসনের নয়, দায়িত্ব এখন আমাদের সকলের। অন্যথায় ‘ন্যায়বিচার’ নামক শব্দটি কেবল পাঠ্যবইয়ে বন্দি থাকবে।
চলবে…





