বিশেষ প্রতিনিধি ২৫ মে ২০২৫ , ৯:৪২:৪২ প্রিন্ট সংস্করণ
সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলা যেন দুর্নীতির নতুন উপাখ্যান রচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আর এই নেপথ্য নায়ক হিসেবে উঠে আসছে একটি পরিচিত নাম—কে এম মাহবুবুর রহমান, যিনি এই উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও)। একজন সরকারি কর্মকর্তার পদে থেকে যেভাবে তিনি ছাতকের প্রকল্পগুলোকে নিজের ব্যক্তিগত লোভ-লালসার যন্ত্রে রূপান্তর করেছেন, তা দেখে স্থানীয় মানুষ বিস্মিত, ক্ষুব্ধ এবং হতাশ।
স্থানীয় ঠিকাদারদের দাবি, পিআইও অফিসে ঢুকতে হলে ‘চাঁদা’ দিতে হয়—ঠিক যেন ঘুষ না দিলে ফাইল নড়বেই না। প্রকল্প অনুমোদনের আগে থেকেই শুরু হয় টাকার দরকষাকষি। কার কত পার্সেন্ট লাগবে, কত ভাগ পিআইও নিবে, কীভাবে বিল উঠবে—সবকিছু যেন পূর্বপরিকল্পিত। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত কাজ না করেই কোটি কোটি টাকার বিল উঠিয়ে ফেলা হয়েছে তার যোগসাজশে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ছাতকের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর পিছনে এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কাজ করে। কিছু মোটা অঙ্কের ঠিকাদার, কিছু জনপ্রতিনিধি এবং দালালচক্র—এইসবের নেতৃত্বে রয়েছেন পিআইও নিজেই। তাঁর নির্দেশ ছাড়া কিছুই হয় না। প্রকল্প যেন ব্যক্তিগত ব্যবসা, আর অফিস যেন তাঁর ব্যক্তিগত রাজত্ব।
একাধিক ইউপি সদস্য ও স্থানীয় জনগণ জানিয়েছেন, বহু উন্নয়ন প্রকল্পে মাঠপর্যায়ে কাজ হয়নি বা অর্ধেক হয়েছে, কিন্তু পুরো বিল উত্তোলন করে নেওয়া হয়েছে। খাল খনন, রাস্তা উন্নয়ন, কালভার্ট নির্মাণ—সবখানেই চলছে “কাগজে উন্নয়ন, বাস্তবে গর্ত” নাটক। সরকারি অর্থ সরাসরি জনগণের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে, আর তাতে সহযোগী এই পিআইও অফিস।
প্রতিদিন শত শত লোক ছুটে যায় ছাতক পিআইও অফিসে, কিন্তু অফিসে পিআইও থাকেন না। ঘন্টার পর ঘন্টা মানুষ বসে থাকে, কিন্তু তিনি উপস্থিত হন না—বা ইচ্ছেমতো সময় নিয়ে আসেন, তাও আবার ‘অবসরে ব্যস্ত’। সরকারি দায়িত্ব পালনের নামে এমন অনিয়ম রীতিমতো জনসাধারণের সঙ্গে প্রতারণা।
সরকারি প্রশাসনের মধ্যে সহনশীলতা এবং পেশাদারিত্ব থাকার কথা থাকলেও, পিআইও মাহবুবুর রহমানের ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি উল্টো। সহকর্মী এক কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব হাতাহাতি পর্যন্ত গড়িয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে একাধিক সূত্র। পিআইও যেন শুধু জনগণের নয়, সহকর্মীদের কাছেও আতঙ্কের নাম।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ চাপা দিতে গিয়ে তিনি দাবি করেছেন, তিনি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন এবং প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন। অথচ এখন পর্যন্ত তাঁর অভিযোগের পক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ বা দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা কেউ দেখেনি। স্থানীয়দের দাবি—এটা তাঁর পরিচিত কৌশল, যাতে নিজের অপরাধ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া যায়।
ছাতকবাসী এখন প্রশ্ন তুলছেন—সরকার যেখানে প্রতিটি পয়সা জনগণের কল্যাণে ব্যয় করার নির্দেশ দিচ্ছে, সেখানে একজন পিআইও কীভাবে নির্লজ্জভাবে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে ছিনিমিনি খেলেন? এমন অবস্থায়, তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে উন্নয়ন নামক এই প্রহসন চলতেই থাকবে।
জনগণের অর্থ, আস্থা এবং উন্নয়নের আশা—সবকিছু যেন এই পিআইওর একগুঁয়ে, দুর্নীতিপরায়ণ মানসিকতার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। প্রশাসন যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে একের পর এক প্রকল্প ধসে পড়বে দুর্নীতির ধ্বংসস্তূপে।
এই দেশে উন্নয়ন টিকে থাকবে কি না, সেটা নির্ভর করছে—এমন কিছু ‘অপ্রতিরোধ্য পিআইও’দের লাগাম টানার ওপর। সময় এসেছে প্রশ্ন তোলার, সময় এসেছে প্রতিবাদ জানানোর।











