প্রতিনিধি ২০ নভেম্বর ২০২৩ , ৯:০২:৪৩ প্রিন্ট সংস্করণ
বিভাগ গল্প
শিরোনাম _পদস্খলন
কলমে অরুণিমা চ্যাটার্জী।
তারিখ_9/10/2023
(স্বত্ব সংরক্ষিত….. অরুণিমা চ্যাটার্জি)
……………………………….
চশমাটা খুলে খাটের উপর রাখলো মাধবী সান্যাল। জানলার বাইরে একই দৃশ্যপট। শরতের মাঝামাঝি। অথচ এখনো কি ভীষণ গুমোট। মেঘলা দুপুর থমকে আছে একটি নিঃসঙ্গ বিকালের অপেক্ষায়। পুরনো সিলিং ফ্যানের হাওয়া গেছে কমে। ওর বাড়ির পরেই মিত্তির জ্যাঠাদের বাড়ি। সরু অপরিসর প্যাসেজটুকুই দুই বাড়ির বিভাজন। মিত্তির জেঠুর নাতনি এই গুমোটেও ছাদে উঠেছে। হাসছে, কানে মুঠোফোন। সারা শরীর খিলখিল করে হাসছে। মাধুরী দেবী ঈষৎ বিরক্ত হলো। স্বভাব গাম্ভীর্যে, এই ধরনের প্রগলভতা ও একেবারেই পছন্দ করেনা। ওর তামাটে মুখে চোয়াল শক্ত হয়। মেয়েটির প্রশংসা করার মতো সুন্দর, রেশমি এক ঢাল কালো চুল। অজান্তেই মাধুরীর হাত চলে যায় তার মাথায়। সামনের দিকটা অনেকটাই পাতলা হয়ে এসেছে। মধ্যে মধ্যে রূপলী ঝিলিক। কই, এসব নিয়ে তো তার বিশেষ মাথাব্যথা নেই। নবমল্লিকা উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের হেড দিদি মনি সে। প্রয়োজনের চেয়েও একটু বেশি গম্ভীর, ব্যক্তিত্বময়ী, সকলের শ্রদ্ধাভাজন।

না চাইতেও একটা কাঠিন্যের আবরণ ওর মুখ ঘিরে থাকে সব সময়। খাটের উপর ছড়ানো ছেটানো পরীক্ষার খাতার বান্ডিল। এই খাতা দেখতে গিয়েই যত বিপত্তি। মধুরিমা ব্যানার্জীর খাতা দেখছিল মাধুরী সান্যাল। মেয়েটিকে চিনতে পেরেছে সে। চুপচাপ, অন্তরমুখী, শান্ত একটি মেয়ে। কিন্তু কি সব লিখেছে সে ! রচনা এসেছিল,”তোমার জীবনের লক্ষ্য”…………. মেয়েটি, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক নিদেন পক্ষে প্রকৃত মানুষ হওয়ার গতানুগতিকতার ধারায় একেবারেই যায়নি। সে বড় দিদিমনির কাছে ক্ষমা চেয়ে, কবিতার মত কি সব আবোল তাবোল লিখেছে। সে ঝর্ণা হতে চায়, নদীদের স্বরলিপি শিখতে চায়, একটা সূর্য স্নাত নতুন পৃথিবী উপহার দিতে চায়। আরো কি সব প্রগলভ এর মতো লিখে গেছে অন্তরমুখী আপাত শান্ত মেয়েটি। মাধুরী তাই চোখ থেকে চশমা খুলেছে। যত্ন করে অনেকক্ষণ ধরে চশমার কাঁচ মুছল। কি নম্বর দেবে একে ? শূন্য বসিয়ে দেবে ! কিন্তু কেন দেবে ! মাধুরী আধ শোয়া হয়ে জানলার বাইরের দৃষ্টি রাখে। পিছিয়ে যায় তিরিশ টা বছর। একটি শ্যামলা সুডৌল হাত লিখে চলেছে। ওই কী যেন বলে ! কবিতা ! হ্যাঁ কবিতাই। যা এখন মাধুরীর দু চোখের বালি। শক্তি, সুনীল, শঙ্খ ঘোষ, জয় গোস্বামী সব তার কন্ঠস্থ ছিল। দৃশ্যপট পাল্টে যায়। মাধুরী আন্দোলনে, মাধুরী মিছিলে, মাধুরী অমিতাভদার বক্ষ মাঝে। ইশতেহার, পাম্পলেট, অমিতাভদার জ্বালাময়ী বক্তৃতায় কেমন নেশা লেগে যেত, স্বপ্ন বুনতো দু চোখ। ইউনিভার্সিটি, ক্যাম্পাস, ন্যাশনাল লাইব্রেরি সর্বত্র মাধুরী আর অমিতাভকে নিয়ে গুঞ্জন। বড় সোজা কথা নয়, দীপ্তবাণ, মেধাবী, অপ্রাতিষ্ঠানিক অমিতাভ তো সারা ইউনিভার্সিটির হার্ট থ্রব। সে কিনা প্রেমে পড়লো ওই শ্যামলা, ছোটখাটো, একহারা মাধুরীর ! বাঙালি মেয়ের যেটুকু লাবণ্য থাকে যৌবনে, সেটুকু থেকে ঈশ্বর তাকে বঞ্চিত করেনি। কিন্তু তারপর? সুদূর অতীত থেকে মিত্তিরদের ছাদে এসে আবার চোখটা থমকে গেল মাধুরীর। এখনো কথা বলছে মেয়েটি? কি এত কথা ওর ! মাধুরী ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে জানে, ও কি বলছে ! আচ্ছা, মাধুরীর এত উষ্মা কেন তাতে ? ওর ভবিষ্যতের চিন্তায় এতটাই ব্যাকুল মাধুরী ? মাসীমণি, মাসীমণি করে ঠিকই মেয়েটা। কিন্তু মাধুরী স্বীকার করুক বা না করুক, ওর ঈর্ষা হচ্ছে। মেয়েটিকে নয়। ওর বয়সটা কে ! ওই সময়টাকে ! কাজের মাসি ঘন ঘন বেল দিচ্ছে। উফ সবার এত তাড়া কিসের ! মাধুরীর তো অখন্ড অবসর। অনেক রাত করে ফিরবে দাদার ছেলেটা। তার একমাত্র স্বজন। দরজা খুলে দিয়ে মাধুরী আবার তার চিন্তায় ডুব দেয়। মধ্য চল্লিশে মেয়েরা নাকি খুব সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। কি জানি ! অমিতাভদা অপেক্ষা করেছিল। মাধুরী নিশ্চিন্ত। বাবা অবসর নিয়েছি ঠিকই। কিন্তু দাদা একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে মোটা মাইনের চাকরি পেয়েছে।। কিন্তু তারপর, তারপর? রঙিন ছবিগুলো কেমন ধূসর সাদা কালো পান্ডুলিপি । বাবার ক্যান্সার, মায়ের কান্না, দাদার অস্থির ছোটাছুটি, ব্যাংক লোন……….. উফ মাথার ভেতর যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। দাদার মাথায় অনেক টাকার ঋণ চাপিয়ে বাবা চলে গেল না ফেরার দেশে। দাদা তখন বিবাহিত। অস্থির অন্যমনস্ক থাকতো দাদা সব সময়। ততোদিনে টুকাই এসে গেছে। টুকাই এর চিন্তা, টাকার চিন্তা আর মাধুর চিন্তায় দাদা কেমন পাগল পাগল হয়ে গেছিল। তারপর এলো সেই বিপর্যয়ের দিন। অফিস থেকে ল্যান্ড ফোনে খবর এলো, দাদা ভয়ংকর ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বৌদি দিশেহারা। মাধুরী একাই সব সামলে ছিল। অবশ্য বিশেষ কিছু করার ছিল না। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। দাদার নিথর দেহটি এসেছিল শুধু। মাধুরী দাদার মাথার কাছ টিতে চুপ করে বসে ছিল। চিরকালই ও শান্ত সংযত। অমিতাভ দা কাঁধে হাত রেখে ছিল। অভায়ের হাত। যেন বলতে চেয়েছিল………”আমি আছি, থাকবো”। সাদাকালো ফ্ল্যাশব্যাক একটু থমকালো। মেয়েটি ছাদ থেকে কখন নেমে গেছে। বৌদি চায়ের কাপ রেখে গেছে অনেকক্ষণ। কথা বলেনি। মাধুরীকে বড় বেশি সম্ভ্রম করে বৌদি। ডেকে মনোযোগ আকর্ষণ করার সাহসটুকু ওর নেই। আবার সেই চলমান শব্দহীন বায়োস্কোপ। ইন্টারভিউ স্কুল, সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা, আর চৈত্রের দুপুরে নিঃসঙ্গ হেঁটে চলা। অমিতাভদার সাথে যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে আসছিল। অবধারিতভাবে বন্ধ হয়ে গেল একদিন। কোন আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ নয়। অবশেষে এই নবমল্লিকা স্কুলের বাংলা দিদিমণি। ফ্ল্যাশব্যাক শেষ হলো। মাধুরী সান্যাল এর ফোন বাজছে। ও প্রান্ত থেকে কেউ বলছে, দিদি, আমার খাতা দেখা শেষ, বাকিদেরও কমপ্লিট। তাহলে সোমবার রেজাল্ট বেরোবার দিন ঠিক করি? ফোন করছে ইংরেজি শিক্ষক বছর ৩২ এর শৈবাল মিত্র। বড় দিদি দিদি করে ছেলেটি। ভালোই লাগ বেশ। আজ হঠাৎ কি যে হল ! গাঢ় গলায় মাধুরী সান্যাল বলে উঠলো, কি যে এত দিদি দিদি কর ! এটাতো স্কুল নয়, তাছাড়া আমি তোমার থেকে বয়সে এমন কিছু বড় নই। বন্ধু ভেবে নাম ধরে ডাকতে পারো। তবে শুধু ফোনে, পারমিশন দিলাম। ও প্রান্ত নীরব। কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা। তারপরই সপ্রতিভ কণ্ঠে ভেসে এলো……… আচ্ছা তাই হবে মাধুরী ! মাধুরী ঠক করে ফোনটা কেটে দিলো। আজকালকার ছেলেগুলো কি স্মার্ট, এতোটুকু জড়তা নেই। মাধুরীর চোখে খুশির ঝিলিক। মধুরিমার খাতায় নম্বর বসিয়ে দিল সত্তর। মধুরিমা যে তারই প্রতিচ্ছবি। ওকে কি ফেল করানো যায়? নিজে তো সে জীবনের পরীক্ষায় ডাহা ফেল করে বসে আছে !