ডেস্ক নিউজ ২২ জানুয়ারি ২০২৬ , ১:৫৪:৪৭ প্রিন্ট সংস্করণ
গণপূর্ত অধিদপ্তরের মহাখালী বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়জুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি দুর্নীতির অভিযোগ জমা পরেছে। অভিযোগপত্রে দুদকের অনুসন্ধানের সুবিধার্থে ফয়জুল ইসলামের নামে ব্যাপক দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের তথ্য তুলে ধরে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে দেখা যায় যে মহাখালী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ. এইচ. এম. ফয়জুল ইসলাম গণপূর্তের একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবেই পরিচিত। পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সখ্যতা থাকায় ঠিকাদারদের সাথে আঁতাত করে বিভিন্ন প্রজেক্টের কাজ শেষ না করেই বিল উঠিয়ে টাকা আত্মসাৎ করতেন তিনি। এমনকি কাজ না করেও ভূয়া বিল ভাউচার করে টাকা উত্তোলন করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের সাথে আঁতাত করেই এই ভূয়া বিল ভাউচার মাধ্যেমে টাকা উত্তোলন করেছেন আওয়ামী ঘরনার এই প্রকৌশলী।
আরো দেখা যায়, জুলাইয়ের রাজনৈতিক সহিংসতায় ক্ষতিগ্রন্থ মহাখালী এলাকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবন, বিআরটিএ ও সেতু ভবনের মেরামত কাজ দরপত্র আহ্বানের আগেই শুরু করার নির্দেশ দেন প্রকৌশলী এ. এইচ. এম. ফয়জুল ইসলাম। পরে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করে নির্ধারিত কিছু আ’লীগ ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেন, যার বিনিময়ে কোটি টাকার নিজের পকেটে ভরেছেন এই কর্মকর্তা।
জানুয়ারী মাস থেকে শুরু করে গত বছরের জুন ক্লোজিং পর্যন্ত হাতে গোনা কয়েকদিন ডিভিশনে অফিস করেছেন তিনি ভলে অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়। অথচ অন্যান্য নির্বাহী প্রকৌশলীরা নিয়মিত অফিস করলেও তিনি কখনো হজ্জ্ব ক্যাম্প কখনো সার্কেল অফিস আবার কখনো জোন অফিসে বসে ফাইলপত্র স্বাক্ষর করতেন।
এছাড়া, স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ পাওয়া কাজগুলো সাধারণত এলটিএম পদ্ধতিতে সম্পন্ন হলেও, অর্থবছরের শেষপ্রান্তে প্রায় অর্ধকোটি টাকার কাজ ওটিএম পদ্ধতিতে করে নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের দিয়ে কাজ করিয়েছেন এ. এইচ. এম. ফয়জুল ইসলাম। এছাড়াও, গত অর্থবছরের ৪-৫ কোটি টাকার বকেয়া বিল ছাড় করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কাছ থেকে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ নিয়েছেন বলেও অভিযোগপত্রে দেখা যায়।
বিশেষত ৪ কোটি ১৮ লাখ ও ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকার বরাদ্দে সেতু ভবনের সিভিল, স্যানিটারি, অডিটোরিয়াম এবং রেক্টোফিটিং কাজ দিয়েছেন অনিক ট্রেডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠানকে, যাদের রেক্টোফিটিংয়ে অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
৩ কোটি ৬০ লাখ টাকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনের সংস্কার কাজ দিয়েছেন এনএল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনকে। ২ কোটি ৫৩ লাখ টাকায় একই ভবনের অ্যালুমিনিয়াম জানালা, ফলস সিলিং, রং ও বাউন্ডারি ওয়াল সংস্কারের কাজ পেয়েছে খান এন্টারপ্রাইজ। যদিও মার্চ মাসে এসব কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে জুলাই পর্যন্ত অনেক কাজ অসম্পূর্ণ ছিল। একইভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের ৮টি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সার ইউনিট নির্মাণ প্রকল্পে উত্তরায় কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ভবন তৈরী, রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং, এসটিপি, ডিপটিউবওয়েল. আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার রিজার্ভার, পাম্প হাউজ ও পানির বিতরণ লাইন, ফুটপাত, বাউন্ডারী ওয়াল লিংক কোরিডর নির্মাণ কাজগুলোতে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি হয়েছে।
এ সকল কাজে সিডিউল বহির্ভূত নিম্নমাণের নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করা সহ কাজ শেষ না হওয়া সত্ত্বেও ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের জুন মাসে এডভান্স বিল দেয়া হয়েছে মোটা অংকের কমিশনের বিনিময়ে।
আরো, গোপন কোটেশন দেখিয়ে ওই অর্থবছরে আরও প্রায় অর্ধকোটি টাকা আত্মসাত করেছেন তিনি। স্বৈরাচার আমলে এ. এইচ. এম. ফয়জুল ইসলাম ছিলেন শেরেবাংলা নগর ৩নং সাব-ডিভিশনের এসডিই ও পরবর্তীতে ২নং ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী। এই সময়েও তার বিরুদ্ধে বেনামী ঠিকাদারী ব্যবসাসহ ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে অধিদপ্তরের সমন্বয় শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত থাকার সুবাদে দেশব্যাপী ফান্ড ডিজবারসমেন্টে বরাদ্দের ০.৫ শতাংশসহ কোন কোন ক্ষেত্রে বিভাগীয় বরাদ্দ থেকে ১ শতাংশ নগদ আদায় করতেন বলেও অভিযোগপত্রে উঠে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে বরাদ্দ কেটে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বা বরাদ্দ বাড়িয়ে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে ২ শতাংশ করে আদায় করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সেখানে বরাদ্দ কাটা-ছেড়ার কাজ করেছেন প্রায় ৬ বছর।
এছাড়া অভিযোগপত্রের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মহাখালী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ. এইচ. এম. ফয়জুল ইসলাম বেনামে অঢেল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। গুলশান এলাকায় ভার দুইটি ফ্ল্যাট, মোহাম্মদপুর দুইটি ছয় তলা বাড়ি ও বসুন্ধারা আবাসিক এলাকায় তার বউ এর নামে একটি ফ্ল্যাট আছে। ঢাকার মোহাম্মদপুরে আলিশান বাড়ি, এছাড়া মিরপুরে একটি বাড়িসহ রাজধানীতে বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট জায়গা জমি কিনেছেন। তার রয়েছে ব্রান্ড নিউ হ্যারিয়ার লেকসাস গাড়ি, রামপুরায় ৬তলা ভবন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ডি ব্লকে ৩ টি ৫ কাঠার প্লট। এছাড়াও মিরপুরের পশ্চিম মনিপুর মোল্লা পাড়ায় রয়েছে আলিশান বাড়ি যার ঠিকানা, বাসা নং-৮৯ পশ্চিম মনিপুর মোল্লা পাড়া, মিরপুর ঢাকা। রাজধানীর উত্তরার ১৩ নং সেক্টর রোড নং-৮ বাসা নং-৯১/৫ এর দ্বিতীয় এবং ৩য় তলায় তার স্ত্রীর নামে রয়েছে আলিশান ফ্ল্যাট। যার বাজার মূল্য প্রায় ৮৫ লক্ষ টাকা। স্ত্রীর নামে কোটি টাকার দুইটি এফডিআর করা রয়েছে। তার বন্ধুর মাধ্যমে বিদেশে টাকা পাচার করেছেন বলেও গুঞ্জন চলছে গণপূর্ত অধিদপ্তরে।
এবিষয়ে মহাখালী গণপূর্ত বিভাগ, ঢাকা এর নির্বাহী প্রকৌশলী এ. এইচ. এম. ফয়জুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তাকে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনো প্রতিউত্তর দেননি।







