নিজস্ব প্রতিনিধি ২৯ জুলাই ২০২৬ , ১১:৪৩:০৪ প্রিন্ট সংস্করণ
সরকারি কোষাগারের মেগা প্রজেক্টের শত কোটি টাকা হরিলুট, টেন্ডার রাজত্বের একচ্ছত্র সিন্ডিকেট, জালিয়াতির মাধ্যমে ১৭ কোটি টাকার ভুয়া বিল পাস এবং নামে-বেনামে রূপকথার অট্টালিকা ও সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পঙ্কিলতম ইতিহাসের পরও স্তব্ধ হয়নি এক দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ডের অপ্রতিরোধ্য দুঃসাহস; বরং রাষ্ট্রীয় নীতি-নৈতিকতার মুখে ছাই দিয়ে, আইনকে তোয়াক্কা না করে এবার গণপূর্ত অধিদপ্তরের সর্বোচ্চ ক্ষমতার মসনদটিই কব্জা করার চূড়ান্ত চক্রান্ত সম্পন্ন হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ফাইলে যার কুকীর্তির পাহাড়ি নথি বন্দি, জাতীয় নিরাপত্তার মতো অতিসংবেদনশীল সংস্থার মেগা প্রজেক্ট থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ ভবনের পবিত্র চত্বর পর্যন্ত যার লুটপাটের বিষাক্ত থাবা বিস্তৃত, সেই ই/এম সার্কেল-৩-এর বিতর্কিত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর হক চৌধুরীকেই অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে আসীন করতে সংস্থাপন শাখা-১ থেকে মন্ত্রণালয়ের সচিবের দরবারে পাঠানো হয়েছে চরম বিতর্কিত এক প্রস্তাবপত্র।
অনুসন্ধানের বেরিয়ে এসেছে, রাজকীয় শঠতা ও বহুরূপী ক্ষমতার চাঞ্চল্যকর রূপরেখা, ওয়ান-ইলেভেনের বিতর্কিত সামরিক কর্মকর্তা ও সাবেক সাংসদ মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ভাগিনা পরিচয়কে চাবুক বানিয়ে টানা ১৭ বছর গণপূর্তের সবচেয়ে লোভনীয় আসনগুলো নিজের পকেটে পুড়ে রাখা এই প্রকৌশলী গত ৫ আগস্টের রাজকীয় পটপরিবর্তনের সাথে সাথেই খোলস বদলে ফেলেছেন এক নিমিষে; রক্তচক্ষু আর ক্ষমতার রাজনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাতারাতি চরমপন্থি রাজনৈতিক ডিগবাজি দিয়ে প্রথমে জামায়াত এবং পরক্ষণেই বিএনপির শীর্ষ সিন্ডিকেটের ভিড়ে গিয়ে ক্ষমতার করিডোরে বহাল রেখেছেন নিজের একক রাজত্ব।
সংসদ ভবনের প্ল্যানারি হলে অত্যন্ত নিচুমানের সাউন্ড সিস্টেম বসিয়ে কোটি কোটি টাকা পকেটে পুরে নেওয়ার চরম খেসারত হিসেবে খোদ সংসদ অধিবেশন চলাকালে অনাকাঙ্ক্ষিত বিভ্রাট ঘটিয়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ধূলিসাৎ করা, কিংবা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আসবাবপত্র ক্রয়ের নামে ৯ কোটি টাকার বরাদ্দে কাল্পনিক কাগজপত্রে ৫ কোটি টাকা উড়িয়ে দিয়ে বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের যে পর্বতপ্রমাণ চাঞ্চল্যকর ফাইল আজ দুদকের তদন্তকারীদের টেবিলে জ্বলজ্বল করছে, সেসবকে এক তুড়িতে উড়িয়ে দিয়ে পদোন্নতির এই উলঙ্গ তোড়জোড় পুরো প্রশাসনিকপাড়ায় অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
এনএসআই-এর ভবন নির্মাণ প্রকল্পে প্রায় ১৭ কোটি ৮ লাখ টাকার চরম আর্থিক কারসাজি এবং বাস্তব কাজের বিন্দুমাত্র অস্তিত্ব না রেখেও ই/এম সার্কেল-৩-এর প্রজেক্টে তড়িঘড়ি করে ১৭ কোটি টাকার পুরো ভুয়া বিল পাস করিয়ে শত কোটি টাকার সরঞ্জাম ও বাজারদরের বিশাল তফাত ঢাকা—সবই তার আজ্ঞাবহ ঠিকাদারদের সমন্বয়ে গড়ে তোলা টেন্ডার সিন্ডিকেটের নগ্ন থাবার ফসল।
ইকবাল রোডের বিলাসবহুল প্রাসাদোপম ফ্ল্যাট, আগারগাঁওয়ের বহুতল রাজকীয় ভবন, উত্তরা ও বসুন্ধরা আভিজাত্যময় আবাসিক এলাকায় সোনার দামে কেনা একের পর এক প্লট থেকে শুরু করে বনশ্রী-আমুলিয়া ভৌগোলিক অঞ্চলে বিস্তৃত প্রায় ১৫ বিঘা জমির অখণ্ড সাম্রাজ্য গড়ে তোলা এই বহুরূপী খলনায়ক ক্যামেরার সামনে মুখে কুলুপ এঁটে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করলেও গণপূর্তের ক্ষুব্ধ প্রকৌশলী ও দুদকের গোয়েন্দা নজরের পারদ এখন তুঙ্গে; ফলে কোটি কোটি টাকার লুটপাট আর দুর্নীতির নীলকশাকে পদোন্নতির পুরস্কার দিয়ে গণপূর্তের শীর্ষ পদে বসানোর এই প্রশাসনিক অপচেষ্টা এখন সাম্প্রতিক ইতিহাসের সাক্ষী হতে যাচ্ছে।
তবে এবিষয়ে অভিযুক্ত প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কৌশলে এড়িয়ে গেছেন।