• ঢাকা, বাংলাদেশ    
  • রবিবার , ২৩ আগস্ট ২০২৬ ,২রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • প্রকৌশল সংবাদ

    ঢাকা-চট্টগ্রাম উড়াল মহাসড়ক: দুই বিভাগের টানাপোড়েন পেরিয়ে সওজের ঘাড়ে ৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার

      নিজস্ব প্রতিনিধি ২৩ আগস্ট ২০২৬ , ১:৫১:৪৯ প্রিন্ট সংস্করণ

    দুই দশকের জট, সমীক্ষার স্তূপ, নকশার নানান ছক, দপ্তরগুলোর দড়ি টানাটানি আর অর্থায়নের অন্ধগলি পেরিয়ে অবশেষে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ঢাকা-চট্টগ্রাম উড়াল মহাসড়ক। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুত এই মেগা অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) এবং সেতু বিভাগের মধ্যে যে প্রকৌশলীক টানাপোড়েন চলছিল, তার অবসান ঘটিয়ে সওজের অধীনেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার পর প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নে নড়েচড়ে বসেছে সওজ।

    কিন্তু এখানেই শেষ নয় বরং শুরু হচ্ছে আসল পরীক্ষা। কারণ ২১৭ কিলোমিটারের এই মহাসড়ক কাগজে যতটা সরল, বাস্তবে তার অর্থায়ন, জমি, টোল, বিনিয়োগ, নির্মাণব্যয় ও ঋণঝুঁকির অঙ্ক ততটাই জটিল। একদিকে দেশের প্রধান বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও রাজধানী ঢাকার মধ্যে পণ্য ও যাত্রী চলাচলের ক্রমবর্ধমান চাপ; অন্যদিকে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রশ্ন।

    সওজ সূত্রের জানা যায়, প্রকল্পটি দ্রুত এগিয়ে নিতে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। তবে অর্থায়নের কাঠামো চূড়ান্ত না হলে সামনে এগোনো কঠিন। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি, নাকি বৈদেশিক দাতাসংস্থার অর্থায়ন কোন মডেলে প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে চলছে পর্যালোচনা। সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এএসএম ইলিয়াস শাহ জানিয়েছেন, প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে; তবে আগে অর্থায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

    ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরকে ঘিরে এই তৎপরতার পেছনে রয়েছে বাস্তবতার নির্মম চাপ। প্রতিদিন ৩০ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচল করা এই মহাসড়ক শুধু একটি সড়ক নয়, এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ধমনি। রাজধানীর সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর এবং ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহনের বড় অংশই এই করিডরের ওপর নির্ভরশীল। ফলে মহাসড়কের সক্ষমতা সীমায় পৌঁছালে তার অভিঘাত পড়ে সরাসরি আমদানি-রপ্তানি, সরবরাহব্যবস্থা, শিল্প উৎপাদন ও জাতীয় অর্থনীতিতে।

    অথচ এই সংকটের সমাধানের চিন্তা নতুন নয়। প্রায় দুই দশক আগেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সমান্তরালে প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০০৪ সালে শুরু হওয়া সেই চিন্তা ২০০৮ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশা প্রণয়নের পর্যায়ে যায়। পরে ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পিপিপির আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের অনুমোদন দেয়। ২১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এক্সপ্রেসওয়ের প্রাথমিক নির্মাণব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার। কিন্তু নানা জটিলতা ও টানাপোড়েনের পর ২০১৯ সালে প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়।

    এরপরও প্রকল্পটির ভূত যেন ফাইলের ভাঁজ ছাড়েনি। সওজ প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সমীক্ষা চালায়। ২০১৪ সালের ১৪ জুলাই একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়। ২০১৬ সালের ২৩ অক্টোবর উড়াল ও সমতল দুই ধরনের অবকাঠামো সমন্বিত নকশা জমা পড়ে। পরে ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার ঢাকা-কুমিল্লা ৮৪ কিলোমিটার, কুমিল্লা-ফেনী ৫২ দশমিক ৮০ কিলোমিটার এবং ফেনী-চট্টগ্রাম ৮০ দশমিক ৯৫ কিলোমিটার এই তিন প্যাকেজে প্রকল্প বাস্তবায়নের সুপারিশ করে।

    ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল পিইসি সভার সুপারিশের পর প্রকল্পের ডিপিপি পুনর্গঠন করা হয়। তখন লক্ষ্য ছিল ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করা। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়েছে, সরকার বদলেছে, পরিকল্পনা বদলেছেো, বদলায়নি শুধু প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা।

    এর মধ্যেই শুরু হয় নতুন আরেক অধ্যায়। সওজ যখন প্রকল্পটি নিয়ে এগোচ্ছিল, তখন ২০১৬ সালের ২৩ অক্টোবর সেতু বিভাগও পৃথকভাবে একই প্রকল্পের উদ্যোগ নেয় এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট বা ইওআই আহ্বান করে। অর্থাৎ একই করিডর, একই স্বপ্ন, অথচ দুই দপ্তরের দুই উদ্যোগ। প্রশাসনিকভাবে এই দ্বৈততা প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানোর বদলে বরং কে করবে, কার অধীনে করবে, এই প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে আসে।

    ২০১৮ সালের ১৫ মে অর্থ বিভাগ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ডিং দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে। পরবর্তী সময়ে পিপিপি কর্তৃপক্ষ এডিবি ও বুয়েটকে ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার হিসেবে নিয়োগ দেয়। ২০১৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-কুমিল্লা অংশের জন্য রেজিস্ট্রেশন অব ইন্টারেস্ট আহ্বান করা হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগ্রহও দেখা দেয়। কিন্তু সেই আগ্রহের শেষ পরিণতি হয়নি; একই বছরের অক্টোবরে প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তে ফের থেমে যায় মহাসড়কের স্বপ্নযাত্রা।

    শুধু সড়ক নয়, একই করিডর ঘিরে হাইস্পিড ট্রেনের স্বপ্নও দেখানো হয়েছিল। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে দ্রুতগতির ট্রেন চালুর লক্ষ্যে রেলওয়ের মাধ্যমে সমীক্ষা ও বিশদ নকশা প্রণয়নে ব্যয় হয়েছে ১১০ কোটি ১৬ লাখ টাকা। কিন্তু বিনিয়োগকারীর অভাবে সেই প্রকল্পও অনিশ্চয়তার ঘূর্ণিপাকে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, একই করিডরে যাত্রী পরিবহনের জন্য রেল আর যাত্রী-পণ্য উভয়ের জন্য এক্সপ্রেসওয়ে- দুটির মধ্যে জাতীয় অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন কোনটিকে কতটা অগ্রাধিকার দেবে?

    সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অবস্থান স্পষ্ট, এক্সপ্রেসওয়ের বিকল্প নেই। কারণ হাইস্পিড ট্রেন মূলত যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বাড়াবে; কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহনের জন্য প্রয়োজন হবে শক্তিশালী সড়ক করিডর। দেশের আমদানি-রপ্তানির বিশাল চাপ সামাল দিতে তাই ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়েকে তারা সময়ের দাবি হিসেবেই দেখছে।

    তবে প্রকল্পের সামনে সবচেয়ে বড় কাঁটা অর্থায়ন। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২১৭ কিলোমিটার অ্যাটগ্রেড ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে প্রায় ৮০০ হেক্টর জমির প্রয়োজন হতে পারে এবং ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর পুরোপুরি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হলে জমির প্রয়োজন কমে প্রায় ৪৫০ হেক্টরে নামলেও নির্মাণব্যয় লাফিয়ে উঠতে পারে প্রায় ৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ মাটির নিচে নয়, মাটির ওপরেই উঠবে ব্যয়ের পাহাড়।

    অন্যদিকে ২৪০ কিলোমিটার হাইস্পিড ট্রেন নির্মাণে প্রায় ৬০০ হেক্টর জমির প্রয়োজন হতে পারে এবং সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। ফলে ব্যয়ের অঙ্কেই স্পষ্ট, কোন প্রকল্প কতটা প্রয়োজন, কতটা বাস্তবসম্মত এবং কোনটির আর্থিক বোঝা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য সহনীয়- তার হিসাব হবে অত্যন্ত কঠিন।

    পিপিপিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সরকারের তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ কমতে পারে। কিন্তু বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের শুধু স্বপ্ন দেখিয়ে অর্থের থলি খুলানো যাবে না। তাদের সামনে রাখতে হবে নিশ্চিত যানবাহন প্রবাহ, বাস্তবসম্মত টোল কাঠামো, সম্ভাব্য রাজস্ব, পরিচালন ব্যয়, বিনিয়োগ ফেরতের সময়সীমা এবং ঝুঁকি ভাগাভাগির সুস্পষ্ট কাঠামো। কারণ কাগজে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প যতই আকর্ষণীয় হোক, বিনিয়োগকারীর চোখে লাভ-ক্ষতির অঙ্কে ফাঁক থাকলে সেই মহাসড়ক আবারও ফাইলের মহাসড়কেই আটকে যেতে পারে।

    বৈদেশিক ঋণে বাস্তবায়ন হলেও ঝুঁকি কম নয়। সুদের হার, গ্রেস পিরিয়ড, ঋণ পরিশোধের সময়সীমা এবং মুদ্রা বিনিময় হারের ওঠানামা প্রকল্পের আর্থিক স্থায়িত্বে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। আজ যে ডলারের হিসাবে ব্যয় ৩ দশমিক ৬ বা ৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন, আগামী দিনের বিনিময় হার ও নির্মাণ ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতিতে সেই অঙ্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে- সেটিও হতে পারে প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অঙ্কের প্রশ্ন।

    এদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দ ছিল ৪৮ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। ব্যবসা-বাণিজ্য, সরবরাহব্যবস্থা ও যোগাযোগ অবকাঠামোর গুরুত্ব বিবেচনায় বরাদ্দ বাড়লেও ঢাকা-চট্টগ্রাম উড়াল মহাসড়কের মতো মেগা প্রকল্পের বিপুল অর্থের সংস্থান আলাদা হিসাব ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা দাবি করে।

    পরিকল্পনা কমিশনও নীতিগত অনুমোদনের অংশ হিসেবে প্রকল্পটি পিপিপিতে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ফলে এখন সওজের সামনে শুধু নির্মাণের দায়িত্ব নয়, দায়িত্ব হচ্ছে দুই দশকের পরিকল্পনাকে এবার বাস্তবতার মাটিতে নামানো।

    কারণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গল্পে সময়ের অভাব নেই, অভাব ছিল সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায়। সমীক্ষা হয়েছে, নকশা হয়েছে, পরামর্শক নিয়োগ হয়েছে, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ নেওয়া হয়েছে, ভিজিএফের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে, শুধু মহাসড়কটি হয়নি। এক দপ্তর চেয়েছে, আরেক দপ্তরও চেয়েছে; ফাইল এগিয়েছে, আবার থেমেছে; পরিকল্পনা হয়েছে, আবার বাতিল হয়েছে। এবার যদি সেই পুরোনো আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধা ফের ফিরে আসে, তাহলে নতুন ঘোষণাও পুরোনো ফাইলের ধুলোয় চাপা পড়তে সময় লাগবে না।

    সওজের ঘাড়ে এখন কেবলই ২১৭ কিলোমিটার সড়কের দায়িত্ব নয়; ঝুলছে দুই দশকের প্রতিশ্রুতির দায়, অর্থনীতির প্রত্যাশা এবং দেশের প্রধান বন্দর করিডরের ভবিষ্যৎ। এই প্রকল্প সফল হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন যুগের দরজা খুলতে পারে; আর আবারও যদি অর্থায়ন, দপ্তরীয় দ্বন্দ্ব, নকশা বদল কিংবা সিদ্ধান্তহীনতার গোলকধাঁধায় আটকে যায়, তাহলে তা প্রকল্পের ব্যর্থতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ একটি জাতীয় অর্থনৈতিক করিডরের সঙ্গে আরেক দফা প্রহসন।

    প্রশ্ন উঠতেই পারে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর সওজ সত্যিই কি ফাইলের ধুলো ঝেড়ে মহাসড়কের ভিত্তিপ্রস্তর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, নাকি ঢাকা-চট্টগ্রাম উড়াল মহাসড়কের স্বপ্ন আবারও সমীক্ষা, সভা, ডিপিপি আর সংশোধনের গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খেয়ে শেষ পর্যন্ত কাগজেই উড়াল দেবে।